রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও জোরদার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এআইভিত্তিক ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে নম্বর প্লেট বিকৃত বা আড়াল করার মতো অসদুপায় অবলম্বন না করে সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান। তিনি রাজধানীর সড়কে আইনের ব্যত্যয় ঘটলে পুলিশ আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সম্প্রতি এক যুবক মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট লুকিয়ে ঘোরাফেরার ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ট্রাফিকের অতিরিক্ত কমিশনার। ডিএমপি জানায়, মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট লুকিয়ে এআই মামলা থেকে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন লাভলু হক নামে এক যুবক। অবশেষে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে নজরে আসে পুলিশের। এরপর সেই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি পুলিশ। এ ঘটনার পর তাকে ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ আদালতে তোলা হলে তাকে এক মাসের কারাদ- এবং জরিমানা করেছেন আদালত।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, এআই প্রযুক্তি নম্বর প্লেট শনাক্ত করে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করলেও নম্বর প্লেট বিকৃত বা আড়াল করা হলে তা শনাক্তকরণে জটিলতা তৈরি হয়। শিগগিরই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ অভিযানে যেসব যানবাহনের নম্বর প্লেট অস্পষ্ট, ভাঙা, বিকৃত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আংশিক ঢেকে রাখা হয়েছে, সেসব যানবাহনের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা। আমরা সবার কাছে একটা বার্তা দিতে চাই, তা হলো মামলার সংখ্যা বাড়ানো এবং জরিমানা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং তাকে সাজা দেওয়া, এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে সচেতন করা। আমরা যেন নিজে থেকে আইন মানার চেষ্টা করি। তার পরও যে ব্যত্যয় হয় না এমন নয়, ব্যত্যয় হয়। যেখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে, সেখানে আমরা কঠোরভাবে বিষয়টি দেখব। আমরা ট্রাফিকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সবাই কাজ করছি। এত অল্প সময়ে নগরবাসী, বিশেষ করে যারা সড়কে যাতায়াত করেন, তারা আমাদের খুব ভালোভাবে সহায়তা করেছেন।
আনিছুর রহমান বলেন, ‘আগে শুধু নম্বর প্লেট-সংক্রান্ত অপরাধে মামলা দায়ের করা হলেও এখন থেকে চালক ও মালিক উভয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ডিমেরিট পয়েন্ট পদ্ধতিতে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কাটা হবে এবং আইন অনুযায়ী জরিমানাও করা হবে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও নজরে আসে, যেখানে দেখা যায় এক মোটরসাইকেলচালক নম্বর প্লেটের শেষ তিনটি সংখ্যা ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রেখে সড়কে চলাচল করছেন। বিষয়টা আমাদের নজরে আসার পর আমরা মনে করলাম বিষয়টি সবাই জানলে অন্যরাও এমনটি করতে পারে। এরপর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত শুরু করে ডিএমপি। তদন্তে জানা যায়, গত ১৯ মে দুপুর আড়াইটার দিকে তেজগাঁও থানার কারওয়ান বাজার ক্রসিং এলাকায় মো. লাবলু হক (৩৮) নম্বর প্লেটের শেষ তিনটি সংখ্যা সাদা স্কচটেপ দিয়ে ঢেকে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস বিভাগের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। পরে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৭২ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- এবং ২ হাজার টাকা জরিমানা করেন।’
তিনি বলেন, এআইকে ফাঁকি দেওয়ার এই অভিনব কৌশল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মামলা দেওয়া, জরিমানা করা কিংবা কাউকে শাস্তি দেওয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়; আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে সচেতন করা, যাতে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মেনে চলে। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আইন অমান্য করে, সে ক্ষেত্রে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ট্রাফিক পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনারা যদি সহায়তা না করেন, তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কাউকে মামলা দেওয়া এবং সাজা দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। যে ব্যক্তি সড়কে মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট লুকিয়ে চলাফেরা করেছে, আমরা ইচ্ছা করলে সেই ব্যক্তিকে আপনাদের সামনে নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু আমরা তা করিনি। যেকোনো বিচারের সঙ্গে মানবিকতার একটা সম্পর্ক থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। নিশ্চিতভাবে তার পরিবার আজ কষ্ট পাবে। তার আত্মীয়স্বজন কষ্ট পাবে। সে নিজেও কষ্ট পাবে এই অপরাধটুকু করার জন্য।’
সিটিটিসির এসপি রাকিব আহমেদ বলেন, ঈদের ছুটির মধ্যে প্রায় এক সপ্তাহ আগে বিষয়টি তাদের নজরে আসে। ঘটনাটি ঘটে গত ১৯ মে। কিন্তু যারা ফেসবুকে ছবিটি ছড়িয়েছেন, তারা সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে পারেননি। ফলে সিসিটিভি ক্যামেরার সহায়তা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তখন ধারণার ভিত্তিতে ঘটনাস্থল খোঁজার চেষ্টা করা হয়। পরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্থানটি তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা এলাকার বিজি প্রেসের সামনে। এরপর ওই এলাকার বিভিন্ন দিক থেকে ছবি তুলে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ঘটনাটি সেখানেই ঘটেছে।
তিনি বলেন, মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটের শেষ তিনটি সংখ্যা ঢেকে রাখা হয়েছিল। তাই সম্ভাব্য সব নম্বর ধরে অনুসন্ধান চালাতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় ৯৯৯টি মোটরসাইকেল যাচাই করা হয়েছে। অনেক মোটরসাইকেল ঢাকার বাইরে চলে যাওয়ায় সেগুলোর মালিকদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। আবার কিছু মোটরসাইকেল ঢাকায় চলাচল করছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়। ধাপে ধাপে যাচাই শেষে সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০তে নামিয়ে আনা হয়। এরপর প্রতিটি মালিকের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করে পুলিশ। তাদের কাছে নম্বর প্লেটের ছবি চাওয়া হয়। কেউ ছবি পাঠিয়েছেন, আবার কেউ জানতে চেয়েছেন কেন ছবি প্রয়োজন। এমনও হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সার্জেন্টকে বাসায় গিয়ে নম্বর প্লেটের ছবি সংগ্রহ করতে হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ওই যুবকের পরিচয় পাওয়া যায়। লাভলু শেখের বাড়ি রাজধানীর লালবাগ এলাকায়। তিনি তেজগাঁওয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত ১৯ মে জরুরি কাজে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হওয়ার সময় মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তার ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে পুলিশ জানতে চায়, তিনি কেন এমন কাজ করেছিলেন। জবাবে লাভলু শেখ জানান, তিনি তেজগাঁও এলাকায় কাজ করেন। সেদিন জরুরি কাজে বের হলেও তার ও সঙ্গীদের কারও হেলমেট ছিল না। এআইভিত্তিক মামলা এড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি নম্বর প্লেটের শেষ তিনটি সংখ্যা ঢেকে দেন। নিজের ও বন্ধুর প্ররোচনায় তিনি এ কাজ করেছিলেন বলে স্বীকার করেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন