রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সম্পূর্ণভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বরাতে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভবনটি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। শুধু তাই নয়, তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে হাসপাতালের দায়িত্বরত সেবিকাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল।
এ সময় মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিলেন না। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এই ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। ওই সময় হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক না থাকা, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে।
তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে তারা করণীয় ঠিক করতে বসবেন আবারও বসবেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনে যে শাস্তি রয়েছে, হাসপাতালের বিরুদ্ধে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সেটা আগামী রোববারের মধ্যেই। তিনি বলেন, এ ঘটনাকে আমরা খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছি। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, তাদের তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় সে প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, তদন্ত কমিটি দেখেছে যে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভবনটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য উপযোগী নয়। তদন্ত কমিটি পোস্ট অপারেটিভ কক্ষ নম্বর-২ পরিদর্শন করেছে। তাদের মনে হয়েছে যে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় ও স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন কার্যক্রম না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি হয়েছে। পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। সংশ্লিষ্ট কক্ষের দায়িত্বরত সব সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছে তদন্ত কমিটি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তাতে প্রমাণ পাওয়া গেছে দায়িত্বরত সেবিকাদের চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল। নবজাতকদের আকস্মিক শারীরিক অবনতিতে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না। সংশ্লিষ্ট নার্স অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া দেননি এবং কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত করেননি। বরং কালক্ষেপণ করতে থাকেন এবং নবজাতকদের মৃত্যু রোধের উপযুক্ত ব্যবস্থাও করা হয়নি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কক্ষটি ৯০০ বর্গফুটের। যেখানে ১১ জন রোগী, নবজাতক, রোগীর লোকসহ প্রায় ৫০ জনের উপস্থিতি ছিল, যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রমাণ মিলেছে যে, তারা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিলেন না। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড নম্বর দুইয়ে রোগীদের দেখাশোনার কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেবিকাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছিল না। কক্ষটিতে আলো-বাতাস চলাচল বা ভেন্টিলেশনের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। কক্ষটিতে অতিরিক্ত লোকজনের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে ব্যবস্থা হবে বলেও জানিয়েছেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা যে ধরনের কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছি, তাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভবিষ্যতে আর কেউ কোনো শিশু বা সাধারণ মানুষকে বদ্ধ ঘরে এভাবে আটকে রাখার মতো দুঃসাহস দেখাবে না। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন শেষ। মন্ত্রী বলেন, অনেকে অনেক কথা বলতে পারেন, তবে লোক দেখানো কোনো কাজ আমি করি না। আইনে যতটুকু কঠোর হওয়ার সুযোগ আছে, আমি তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করব। আমরা হাসপাতালের সামগ্রিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ লক্ষ্যে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এ ঘটনার পর সারা দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর তীক্ষè নজর রাখা হচ্ছে। বিভাগীয় পরিচালক, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ভবন পরিদর্শন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
ময়নাতদন্ত ও আইনি জটিলতায় নিহত নবজাতকদের ময়নাতদন্ত না হওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। পুলিশ ও সিআইডির অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও শোকাতুর মায়েদের আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি বিশ্বাস করেন যে, এটি যেহেতু প্রমাণিত ঘটনা, তাই আদালত অবশ্যই বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখবেন। হাসপাতালের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য ও হাসপাতালটির বৈধতা সম্পর্কে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে তাদের প্রাথমিক অনুমোদন ছিল। তবে রাজউকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা পরবর্তী সময়ে ভবনের অনেক পরিবর্তন করেছে যা আইনসংগত নয়। তারা সেখানে নবম তলায় বেকারি করেছে। এ বিষয়ে রাজউক আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
একই কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস। গতকাল বৃহস্পতিবার রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এবং আমাদের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রায় এক। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট গাফিলতি প্রমাণ পেয়েছে। তাই আমরা এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স। আইন অনুযায়ী হাসপাতালের বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তাই নেওয়া হবে।
তবে মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের এসব প্রতিবেদনের বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অনাকাক্সিক্ষত এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খুবই ব্যথিত। যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয় তাই মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই আমরা আমাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আপনাদের জানাব। আপাতত দুঃখপ্রকাশ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।
উল্লেখ্য, ঈদুল আজহার আগের দিন (২৭ মে) ভোরে মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছয়টি নবজাতক আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর অল্প সময়ের ব্যবধানে একে একে ছয় শিশুরই মৃত্যু হয়। পরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে ওই দিনই হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে রমনা থানায় একটি মামলা করা হয়।

