মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, কূটনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিল সমীকরণের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক। একদিকে ইরানের সঙ্গে স্থায়ী সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সতর্ক করেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নেবে, যা ইরানের পছন্দ হবে না।
মেরিল্যান্ডে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে। যদিও তিনি একই সঙ্গে আশা প্রকাশ করেন যে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সংঘাতের দিকে গড়াবে না।
এই মন্তব্য এমন একসময়ে এলো, যখন সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান কারিগরি পর্যায়ের আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান খুঁজে বের করা।
সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনা : উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে লেবাননে চলমান সংঘাতের কারণে বৈঠকটি স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
তবে নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আবারও আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, এই আলোচনা সফল হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যুদ্ধবিরতির পরও লেবাননে হামলা : যদিও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, বাস্তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও দক্ষিণ লেবাননে একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে বহু মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের কয়েকজন সেনা নিহত হয়েছে।
ট্রাম্প বনাম নেতানিয়াহু মতপার্থক্যের ইঙ্গিত : মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে নতুন একটি বিষয় উঠে এসেছে। তাদের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনের আগে তিনি কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে অনাগ্রহী। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতার অন্যতম শর্তÑ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ : ট্রাম্প তার বক্তব্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে শত শত জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে এবং সামুদ্রিক পরিবহন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
তবে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা বিঘিœত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরাকে নতুন গোপন সেল নিয়ে উদ্বেগ : এদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরাকে নতুন গোপন সেল গঠন করেছে। এসব ছোট গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনা করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সেলগুলো প্রচলিত মিলিশিয়া কাঠামোর বাইরে থেকে সরাসরি ইরানের কাছে জবাবদিহি করে। তাদের সদস্যসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এবং ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ।
ইরাকি নিরাপত্তা সূত্রগুলো দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কয়েকটি ড্রোন হামলার সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর দুর্বলতার কারণে ইরান এখন বড় নেটওয়ার্কের বদলে ছোট কিন্তু অধিক অনুগত গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করার কৌশল গ্রহণ করছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ : বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক সংলাপ এবং সম্ভাব্য স্থায়ী চুক্তির আশা; অন্যদিকে লেবাননে চলমান উত্তেজনা, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র মতপার্থক্য এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ।
আগামী ৬০ দিনের আলোচনা তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের পথ থেকে স্থায়ী শান্তির দিকে অঞ্চলটি এগোবে, নাকি নতুন সংঘাতের মুখোমুখি হবেÑ সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে সামনের কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন