মধ্যপ্রাচ্যে আবারও দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। মাত্র এক সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংঘাত কমার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে টানা পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ, ইরানের পাল্টা হামলার দাবি এবং বাহরাইনে ড্রোন হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও চরমে পৌঁছেছে।
বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ড্রোন দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে হামলার চেষ্টা চালায়। হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরই ছিল প্রধান লক্ষ্য। বাহরাইন এ ঘটনাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে দেশটি আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের কথাও জানিয়েছে।
ইরান তাৎক্ষণিকভাবে বাহরাইনে হামলার বিষয়টি স্বীকার করেনি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে তারা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তেহরানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুধু যুদ্ধবিরতিই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদেরও লঙ্ঘন।
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা যুদ্ধবিরতির চেতনার পরিপন্থি। এর জবাবে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিযানের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ হামলার সক্ষমতা দুর্বল করা।
ইরান জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দরের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর তাদের নৌবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়। তবে কোথায় হামলা হয়েছে বা কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি তেহরান।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির সব শর্ত মেনে চলেছে। তার ভাষায়, ইরানের কোনো আপত্তি থাকলে আলোচনার পথ খোলা ছিল। কিন্তু হামলার জবাব হামলাতেই দেওয়া হবে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে ইরান নতুন করে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর শক্তি প্রয়োগ করবে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তাদের নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় সফল আঘাত হেনেছে। বাহিনীটির দাবি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার অধিকার ইরানের রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই বাস্তবতা অস্বীকার করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে তারা যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার প্রতি আন্তরিক নয়। তার মতে, সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। হামলার তীব্রতা বাড়ার আগেই অধিকাংশ সেনা ও কর্মকর্তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এতদিন উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী ও বড় সামরিক ঘাঁটিকে নিরাপদ মনে করা হলেও সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়েছে, তুলনামূলক কম ব্যয়ের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ঝুঁকির মুখে ফেলা সম্ভব। ফলে একটি বড় ঘাঁটির পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে বাহিনী ছড়িয়ে দেওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ¦ালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ¦ালানি বাজার, নৌপরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল এবং যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে উভয় পক্ষ কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল, নতুন এই পাল্টাপাল্টি হামলা সেই উদ্যোগকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল হিসাবও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তাই উত্তেজনা আরও বাড়ার আগেই উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং আলোচনায় ফিরে আসার ওপর আন্তর্জাতিক মহল জোর দিচ্ছে। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

