ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

কঠোর মনিটরিং ছাড়া ভেস্তে যাবে সব স্বপ্ন ও পরিকল্পনা

পারভেজ খান
প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৫:৪৭ এএম

বাজেট পাস হলো গত ৩০ জুন। গতকাল বুধবার অর্থাৎ ১ জুলাই ছিল নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন। ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ হলেও অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি নতুন বাস্তবতার শুরু। গতকাল থেকেই কার্যকর হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন কর, শুল্ক ও রাজস্ব ব্যবস্থা। সরকার বলছে, এটি হবে বিনিয়োগবান্ধব ও প্রবৃদ্ধিমুখী বাজেট। তবে অনেক অর্থনীতিবিদের দাবি, এই বাজেট উচ্চাভিলাষী, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অবাস্তব এবং বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে বিরোধী দল এই বাজেটকে অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ, অবাস্তব ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য বলে মন্তব্য করেছে। তাদের অভিযোগ, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের জন্য কার্যকর স্বস্তির ব্যবস্থা নেই বাজেটে।

বিপরীতমুখী এমন প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বাজেটের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে সরকার যেন তার তদারকি বা বাজার মনিটরিং সঠিকভাবে কার্যকর রাখে। কারণ একটি মহল সবসময়ই শকুনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যেসব খাতে কর বাড়েনি সেসব খাতেও যেকোনো অজুহাতে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে ফায়দা লোটার অপতৎপরতায় লিপ্ত তারা। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে না দেওয়া, পারলে নিম্নমুখী রাখার ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ মানুয়ের চাওয়া-পাওয়া। অন্যথায় সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এর চাপে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে বৈ কমবে না।

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যার ৪৬ শতাংশ বিদেশি ঋণ ও সহায়তা থেকে এবং ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎসÑ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নÑ এই বাজেটের প্রভাব কাল থেকে কতটা অনুভূত হচ্ছে?

অর্থনীতিতে একটি পরিচিত কথা আছে, ‘করের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই এসে পড়ে। নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই বেশ কয়েকটি পণ্য ও সেবায় ভ্যাট, শুল্ক বা সম্পূরক শুল্কের পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। ফলে অনেক আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্য, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিকস পণ্য, কিছু খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁ সেবা, অনলাইন সেবা এবং বিলাসপণ্যের দামে ধীরে ধীরে প্রভাব পড়বে। পড়বে কিংবা পড়তে শুরু করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পণ্যের দাম বাড়ে না। তবে কর বাড়লে উৎপাদক, আমদানিকারক ও পরিবেশক পর্যায় পেরিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার প্রভাব বাজারে স্পষ্ট হতে শুরু করে।

ঢাকার কারওয়ান বাজারের এক মুদি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলো গতকাল বুধবার সকালে। তার মতে, ‘আজকেই সব পণ্যের দাম বাড়েনি। কিন্তু আমদানিকারক ও পাইকাররা নতুন দরে হিসাব করছেন। কয়েক দিনের মধ্যে পণ্যের নতুন মূল্য দেখা যাবে।’

সরকার এবারো চাল, আটা, ডালসহ বেশকিছু মৌলিক খাদ্যপণ্যে সরাসরি করের বড় ধরনের চাপ না বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কর কমালেই দাম কমবে, এমনটা নয়। পরিবহন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানি ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও মূল্য নির্ভর করে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. আরেফিন আহমেদ গতকাল কথা প্রসঙ্গে বললেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি অনেক সময় করের কারণে নয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সরবরাহ সংকটের কারণেও বাড়ে। আর তাই বাজেটের কর-ব্যবস্থার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসের খুচরা মূল্য বাড়ানোর কোনো সরাসরি ঘোষণা নেই। তবে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি কমানোর নীতি বহাল থাকায় ভবিষ্যতে মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রেই।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের একটি উক্তি স্মরণ করে দিয়ে ড. আরেফিন বলেন, তিনি সবসময়ই বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন।’ এটাই মূল কথা।

খবর নিয়ে দেখা গেছে, গতকাল থেকে বাসভাড়া বা রেলভাড়ায় সরাসরি কোনো সরকারি পরিবর্তন কার্যকর হয়নি। তবে পরিবহন মালিকরা দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি ব্যয়, যন্ত্রাংশ আমদানি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলে আসছেন। যদি এসব ক্ষেত্রে কর বা আমদানি ব্যয় বাড়ে, তাহলে পর্যায়ক্রমে পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর অর্থÑ আজকের প্রভাব সীমিত হলেও ভবিষ্যতের চাপের আশঙ্কা থাকছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কর কাঠামোর কিছু পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। ফলে মোবাইল সেবা, ইন্টারনেটনির্ভর কিছু প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল সেবার ব্যয় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাড়তে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের যুগে অতিরিক্ত কর আরোপ করলে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তারা চাপে পড়তে পারেন।

অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় বলেছেন, এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।

ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে কর-সুবিধা, শিল্প বিনিয়োগে উৎসাহ এবং উৎপাদনমুখী খাতে প্রণোদনার বার্তা রাখা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশ মনে করছে, উচ্চ সুদের হার, ডলার সংকট এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তা কাটানো না গেলে শুধু বাজেট দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।

এবারের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, অতীতের রাজস্ব সংগ্রহের ধারা বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। যদি রাজস্ব কম আসে, তাহলে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে অথবা উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হতে পারে।

এই বাজেটে ২ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ বিদেশি উৎস এবং ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণ তুলনামূলক সস্তা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সুদের চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে দেশীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিরোধী দল বাজেটকে ‘অপরিকল্পিত, অবাস্তব ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে। তাদের অভিযোগ, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের জন্য কার্যকর স্বস্তির ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের পরিকল্পনাকেও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অবশ্য সরকার বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে এমন বাজেট প্রয়োজন ছিল।

বসুবন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাজেট বড় না ছোটÑ এসব আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাজারে গেলে যদি চাল, ডাল, তেল আর সবজির দাম কম না পাই, তাহলে বাজেটের সুফল বুঝব কীভাবে? প্রতি মাসে সংসারের খরচ নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে। বাজেটের পরে যদি আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, তাহলে সংসার চালানো আরও কঠিন হবে।’

এই কথাগুলোই মূলত দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।

বাজেটের প্রথম দিনে সাধারণ মানুষের জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায় না। কিন্তু আজ যে কর ও নীতিগুলো কার্যকর হলো, তার ঢেউ আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে বাজারে ছড়িয়ে পড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সফলতা কেবল তার আকারে নয়; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংগ্রহ, উন্নয়ন প্রকল্পের দক্ষ বাস্তবায়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে। বড় বাজেট ঘোষণা করা সহজ; কঠিন হলো সেটিকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব উপকরণে পরিণত করা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের যাত্রা শুরু হয়েছে গতকাল। এখন নজর রাখতে হবে, এই ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, বাজারের থলে, বিদ্যুতের বিল, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের আয়ে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। সেই উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের অর্থনৈতিক বাস্তবতায়।