ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬

সম্ভাবনা থাকলেও নেই উদ্যোগ

উপেক্ষার বেড়াজালে বন্দি সিলেট-কক্সবাজার ট্রেনসেবা

সালমান ফরিদ, সিলেট
প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৫:৫৩ এএম

সিলেট-কক্সবাজার দুটিই দেশের প্রধান পর্যটন রাজধানী। একটি চায়ের দেশ সিলেট, অন্যটি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। ‘প্রাকৃতিক পর্যটন’ ছাড়াও সিলেট দেশের প্রধান ‘তীর্থ পর্যটন ভূমি’ হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি হলেও কক্সবাজার-সিলেট দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও পর্যটনের টান নিবিড়। প্রতিবছর সিলেট থেকে লাখ লাখ মানুষ কক্সবাজার ভ্রমণে যান। একইভাবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষ সিলেটে আসেন। কিন্তু এত চাহিদার পরও এখন পর্যন্ত সিলেট-কক্সবাজার রুটে সরাসরি কোনো ট্রেন সার্ভিস নেই। এমনকি সুযোগ থাকার পরও এই সেবা চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ একটি সরাসরি রেল যোগাযোগ দুই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পর্যটনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশ্বাস সংশ্লিষ্টদের।

বর্তমানে সিলেট-কক্সবাজার রুটে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম দূরপাল্লার বাস। তবে যারা ট্রেনে যেতে চান তারা সিলেট থেকে চট্টগ্রাম যান এবং চট্টগ্রাম থেকে বাস বা ট্রেনে তাদের কক্সবাজার যেতে হয়। সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন দুটি করে ট্রেন চলাচল করে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিন সিলেট থেকে কক্সবাজার রুটে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস, ইউনিক সার্ভিস, এনা পরিবহন এবং সৌদিয়া মার্সিডিজ বেঞ্জের মতো বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল ও সাধারণ বাস চলাচল করে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে ও ঈদের ছুটিতে এই রুটে টিকিটের জন্য রীতিমতো হাহাকার পড়ে যায়। নিয়মিত চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রী ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার পর্যটক এই রুটে যাতায়াত করেন। কিন্তু বাসের আসন সংখ্যা সীমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ ছাড়া উৎসবের দিনগুলোতে টিকিট কিনতে হয় চড়া দামে। তার ওপর এই দীর্ঘ সড়কপথ যেমন ক্লান্তিকর, তেমনি অনেক সময় অনিরাপদ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বর্তমানে এই বাসগুলোর ভাড়া আসন ও মানভেদে নন-এসি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। এসি বাসের ক্ষেত্রে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য এটি বেশ ব্যয়বহুল।

সাধারণত বাসে সিলেট থেকে কক্সবাজারে পৌঁছাতে যানজটের কারণে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অন্যদিকে এই রুটে সরাসরি ট্রেন চালু হলে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় বাঁচানো সম্ভব। এ ছাড়া খরচের দিক থেকেও ট্রেন বাসের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী। বর্তমানে রেলওয়ের বিদ্যমান ভাড়া সমন্বয় করে হিসাব করলে দেখা যায়, সিলেট থেকে চট্টগ্রাম রুটে আন্তঃনগর ট্রেনের শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৭৫ টাকা এবং এসি সিটের ভাড়া ৭১৯ টাকা (ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ ছাড়া)। আবার চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে শোভন চেয়ারের ভাড়া ২৫০ টাকা এবং এসি সিটের ভাড়া ৪৭০ টাকা। এই দুটি রুটের ভাড়া সমন্বয় করলে সিলেট থেকে কক্সবাজার রুটে সম্ভাব্য ট্রেনের শোভন চেয়ারের ভাড়া দাঁড়ায় ৬২৫ টাকা এবং এসি সিটের ভাড়া দাঁড়ায় ১ হাজার ১৮৯ টাকা। অর্থাৎ বাসের তুলনায় ট্রেনে যাতায়াত করলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পর্যটকদের ভ্রমণ খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে।

এই সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে দুই অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে ‘ট্যুরিজম করিডোর’ তৈরি হবে, যা স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থনৈতিক জোয়ার সৃষ্টি করবে। শুধু পর্যটনই নয়, সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে কক্সবাজারের শুঁটকি, লবণ ও সামুদ্রিক মাছ খুব সহজে এবং কম খরচে সিলেটে আনা যাবে। পক্ষান্তরে সিলেটের চা ও অন্যান্য পণ্যও দ্রুততম সময়ে কক্সবাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট-কক্সবাজার রুট চালু করা শতভাগ সম্ভব এবং এর জন্য নতুন কোনো রেললাইন স্থাপনের প্রয়োজন নেই। সিলেট থেকে আখাউড়া ও কুলাউড়া হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের মূল রেললাইনে সহজেই যুক্ত হওয়া যায় এবং চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত এরই মধ্যে আধুনিক রেললাইন সম্পূর্ণ সচল রয়েছে। সরকার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চাইলে বিদ্যমান এই রেললাইন, অবকাঠামো এবং বর্তমান ভাড়া সমন্বয় করেই প্রতিদিন ‘সিলেট-কক্সবাজার স্পেশাল’ বা একটি নিয়মিত আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা যেতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন শুধু রেল বিভাগের সদিচ্ছা।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন চালুর পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারে ট্রেন চালুর দাবি ওঠে। সব রকম সুযোগ থাকায় এই দাবি উঠলেও রেল মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সিলেট-কক্সবাজার রুটে সরাসরি ট্রেন চালুর বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি। বর্তমান সরকারের কোনো মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকও এই বিশেষ রুটটি নিয়ে এখনো নীতিগত কোনো বক্তব্য বা আশ্বাস দেননি। অবশ্য সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে সিলেটের এই অবহেলিত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সোচ্চার হয়েছেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, বর্তমানে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিভিন্ন নাগরিক সংবর্ধনা ও সেমিনারে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের, বিশেষ করে পর্যটন নগরীগুলোর, রেল ও বিমান যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে এসেছেন।

অন্যদিকে সিলেট-১ আসনের এমপি ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ফোরামে সিলেটের যোগাযোগ খাতের বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা করেন। ওই সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, সিলেট অঞ্চল সরকারের রাজস্বে বড় অবদান রাখলেও রেলওয়ের পুরোনো বগি-ইঞ্জিন সংকট ও আধুনিকায়নে চরম অবহেলার শিকার। সিলেট-কক্সবাজারের মতো অত্যন্ত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় রুটে সরাসরি ট্রেন চালু না হওয়াকে তিনি দূরদর্শিতার অভাব হিসেবে উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন বলেন, সিলেট-কক্সবাজার ট্রেন সার্ভিস শুধু সময়ের দাবি নয়, এটি রেলওয়ের জন্যও একটি অত্যন্ত লাভজনক খাত হবে। তাই সরকারের উচিত দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করে অন্তত সপ্তাহে দুই-তিন দিন হলেও এই রুটে সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু করা।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মো. নূরুল ইসলাম জানান, সিলেট থেকে দেশের যেকোনো গন্তব্যে রেলসেবা শুরুর সক্ষমতা রয়েছে। আধুনিক স্টেশন সুবিধার জন্য সিলেটের সুনাম আছে। সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ মুহূর্তে সিলেট-কক্সবাজার রেলসেবা চালু না থাকলেও বা চালু না হলেও অদূর ভবিষ্যতে এই সেবা চালুর সব সম্ভাবনা রয়েছে।