ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

বললেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

অপ্রয়োজনে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:১০ এএম

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ভুলনীতির কারণে এখনো অপ্রয়োজনীয় প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। যার কারণে প্রয়োজন না থাকলেও এসব বাড়তি বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের বিশেষ আইন বাতিল হলেও যেসব চুক্তি আগে থেকেই চলমান ছিল সেগুলো তো আর বাতিল হয়নি। তাই এসব কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতেই হচ্ছে।’ যা বিএনপি সরকারের জন্য বড় একটি বোঝা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ ভবনে ‘বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ খাতের অগ্রাধিকার, জনকল্যাণে গৃহীত ব্যবস্থা, মিটার ভাড়া এবং জুন ২০২৬ মাসের বিদ্যুৎ বিল-সংক্রান্ত বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য’ বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় এক প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে কোনো রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু নেই এবং সেগুলোর বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধও করা হচ্ছে না। তবে যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে, শুধু সেগুলোর ক্ষেত্রেই চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।’ বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের প্রসঙ্গে সচিব বলেন, ‘আইনটি বাতিল হলেও এর আওতায় আগে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো আইন অনুযায়ী বহাল থাকবে। তবে ভবিষ্যতে ওই আইনের অধীনে নতুন কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর খাত। কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাতারাতি বন্ধ করে দিলে তার বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন ও গ্রাহকসেবার স্বার্থে বিদ্যমান চুক্তিগুলো বাস্তবতা বিবেচনায় পরিচালনা করা হচ্ছে।’

এসময় লিখিত বক্তব্যে মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘সম্প্রতি জুন ২০২৬ মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশন করেছে। পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্মানিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটরগণ সোশ্যাল মিডিয়াতে কয়েকজন গ্রাহকের অভিযোগ উপস্থাপন করেছেন। বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রকৃত সত্য তুলে আনার জন্য সব বিতরণ সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীরও নজরে আসায় তিনি নিজে এ বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ অভিযোগ প্রাপ্তির পর তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং সিংহভাগ অভিযোগই এরই মধ্যে নিষ্পন্ন হয়েছে (কপি সংযুক্ত)। এক্ষেত্রে কারো দায়িত্বে অবহেলা কিংবা গ্রাহক হয়রানির সংশ্লেষ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনাও প্রদান করা হয়েছে।’

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য এবং মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে টেকসই করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা, বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিদ্যুৎ সচিব বলেন, ‘আপনাদের সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক জুন ২০২৬ থেকে বিদ্যুতের জন্য নতুন ট্যারিফ কার্যকর হয়েছে। তবে সরকার নি¤œআয়ের গ্রাহকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এবারই প্রথম বিদ্যুৎ বিভাগের অনুরোধে প্রান্তিক ও নি¤œআয়ের (লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের আবাসিক) গ্রাহকদের ক্ষেত্রে পূর্বের ট্যারিফ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্য বা উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের ওপর যেন অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়েÑ সেই বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখে বিদ্যুতের ট্যারিফ সহনীয় পর্যায়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে।’

সচিব বলেন, ‘বিদ্যুৎ মূল্যহার জুন-২০২৬ মোতাবেক গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্য সমন্বয়ের ফলে একই পরিমাণ অর্থ রিচার্জের বিপরীতে পূর্বের চেয়ে কম ইউনিট বিদ্যুৎ অর্জিত হচ্ছে। স্বভাবতই, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য গ্রাহকের সামগ্রিক মাসিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রিপেইড গ্রাহকদের আগের চেয়ে ঘন ঘন রিচার্জ করতে হচ্ছে, যা অনেক গ্রাহকের কাছে সাময়িকভাবে অস্বাভাবিক অর্থ কর্তন বলে প্রতীয়মান হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত, ঈদুল আজহা, গ্রীষ্মকালীন অতিরিক্ত তাপমাত্রা, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার কারণে সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বাসাবাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র, ফ্যান, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহারও আগের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।’ অধিকাংশ ক্ষেত্রে জুন মাসের বিল বৃদ্ধি শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণেও হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সচিব।

এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘কিছু গণমাধ্যম এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রচার না করায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে সংবাদ প্রচারের আগে আমাদের বিতরণ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। আর কারও যদি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এসেছে বলে মনে হয়, আমরা তাদের বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করতে বলছি। কোনো ক্ষেত্রে ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে তা ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমসহ অন্যান্য সংস্থার প্রধানরা।