গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানার জিরানী বাজার এলাকায় অবস্থিত সাইন্সল্যাব হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতাল পরিচালনা এবং একাধিক গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় এক ভুয়া চিকিৎসক ও হাসপাতালের ম্যানেজারকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনজনের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়েছে।
জেলা এনএসআই, গাজীপুর কার্যালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে গত রোববার (৫ জুলাই) বিকেলে এ অভিযান পরিচালনা করেন গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. সালেহুর রহমান। অভিযানে জেলা প্রশাসন, এনএসআই, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সাইন্সল্যাব হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় সরকারি নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে হাসপাতালের বিভিন্ন নথিপত্র, চিকিৎসা কার্যক্রম, ল্যাবরেটরি এবং ব্যবস্থাপনা যাচাই করে একাধিক গুরুতর অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়।
অভিযানে দেখা যায়, হাসপাতালটির সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছিল। হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পরীক্ষার মান যাচাই কিংবা নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অন্য চিকিৎসকের নামে ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল, যা চিকিৎসা নীতিমালা এবং প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তদন্তে আরও জানা যায়, কাওসার আহমেদ নামে এক ব্যক্তি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) বৈধ নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখছিলেন এবং প্রেসক্রিপশন দিচ্ছিলেন। বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিএমডিসি আইন, ২০১০-এর ৮ ধারায় তাকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
একই আইনে হাসপাতালের ম্যানেজার লিটন হোসেনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারায় এসএম বুলবুল ইসলামকে ৫০ হাজার এবং হাসপাতাল পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাহাদি হাসানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। বিএমডিসি আইন অনুযায়ী, লিটন হোসেনকে আরও ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সব মিলিয়ে তিনজনের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত মনে করেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনা, ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে রোগী চিকিৎসা, নিম্নমানের ল্যাবরেটরি পরিচালনা এবং চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনের অপব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে সাইন্সল্যাব হাসপাতালটি তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সালেহুর রহমান বলেন, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে চলবে। জনগণের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ অভিযানে এলাকাবাসী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন।

