দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলোÑ অবকাঠামো নির্মাণ। একটি সড়ক, সেতু, রেলপথ বা বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, এগুলো একটি দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক সংযোগের ভিত্তি। কিন্তু যখন উন্নয়ন প্রকল্পই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের আস্থা, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সেই তিক্ত বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।
সোমবার রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রেল প্রকল্পে নকশা পরিবর্তন, কাজ না করেই বিল উত্তোলন, অতিরিক্ত পরিমাপ দেখিয়ে অর্থ আদায়, নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ভুয়া চুক্তি, বাসা ও গাড়ি ভাড়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট করেছে। বিষয়টি এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হবে কি না, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রকল্প নিয়ে অতীতেও নানা অনিয়মের তথ্য বিভিন্ন সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আইএমইডির মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়নে কাজের নি¤œমান, প্রয়োজনীয় পাথর (ব্যালাস্ট) না দেওয়া, সেতু নির্মাণে গাফিলতি, স্টেশন নির্মাণে চুক্তিভঙ্গ এবং পুনর্বাসিত রেলপথের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। অর্থাৎ অভিযোগগুলো একেবারে ভিত্তিহীন, এমনটি বলার সুযোগও নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া পর্যবেক্ষণ বর্তমান অভিযোগগুলোকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানায়।
এ ধরনের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়। নি¤œমানের কাজের কারণে কয়েক বছর না যেতেই আবার নতুন সংস্কার প্রকল্প নিতে হয়। অর্থাৎ জনগণ একই অবকাঠামোর জন্য বারবার কর দেয়, অথচ টেকসই সুবিধা পায় না। উন্নয়ন তখন আর জনকল্যাণের হাতিয়ার থাকে না; বরং কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে। এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ে, উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত। যদি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা, ঠিকাদার, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে থাকেন, তবে তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। শুধু অনুসন্ধান শুরু করাই যথেষ্ট নয়; তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগও নিতে হবে।
এর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও শিক্ষা নেওয়া জরুরি। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা, তৃতীয় পক্ষের গুণগত মান যাচাই, ব্যয়ের স্বচ্ছ প্রকাশ এবং প্রকল্প পরিচালকদের ব্যক্তিগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রকল্পে ঠিকাদার নির্বাচন থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার আওতায় আনতে না পারলে একই ধরনের অনিয়ম আবারও ঘটবে।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের জন্য একটি কৌশলগত অবকাঠামো। তাই এই প্রকল্পকে দুর্নীতির প্রতীক নয়, সুশাসনের উদাহরণে পরিণত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য। উন্নয়নের নামে লুটপাটের সংস্কৃতি যতদিন চলবে, ততদিন জনগণের করের অর্থে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। এখন সময় এসেছে স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার। সংস্কারের নামে আর কোনো লুটপাট নয়, উন্নয়ন হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে।

