ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

২০ লাখ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত

পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৭:২৪ এএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৩০ জুন চালু হওয়ার কথা ছিল পিরোজপুরের বহুল প্রত্যাশিত ২৫০ শয্যার আধুনিক জেলা হাসপাতাল। তবে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র (ফার্নিচার) ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালটির উদ্বোধন সম্ভব হয়নি। এতে পিরোজপুরসহ আশপাশের অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশা আবারও পিছিয়ে গেছে। বারবার উদ্বোধনের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল ভবনের লিফট এখনো স্থাপন না হওয়ায় প্রাথমিকভাবে নিচের চারটি তলায় চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই ৩০ জুন সম্ভাব্য উদ্বোধনের তারিখও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় ফার্নিচার সময়মতো সরবরাহ না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

হাসপাতালের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩১ শয্যা নিয়ে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় ৫০ শয্যার নতুন ভবন এবং ২০০৫ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। পরবর্তীতে জেলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও চিকিৎসা চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে ২০১৭ সালে ২৫০ শয্যার এই আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। শুরুতে সাততলা ভবনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা নয়তলায় উন্নীত করা হয়। প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটির মূল অবকাঠামোর কাজ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হলেও লিফট, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় এটি চালু করা সম্ভব হচ্ছিল না।

গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, ভবনে লিফট স্থাপনে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। তাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে লিফট ছাড়াই নিচের চারটি তলা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পর্যাপ্ত ফার্নিচার না পৌঁছানোয় সেটিও আটকে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণা করেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যথাযথ দূরদর্শিতা ও পরিকল্পনার অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

নিকচন আকন নামে এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছিলাম ৩০ জুনের মধ্যে এই নতুন হাসপাতালটি চালু করা হবে, কিন্তু হলো না। পুরোনো হাসপাতালে গাদাগাদি করে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। আমরা দ্রুত নতুন ভবনটি চালুর দাবি জানাচ্ছি।’ রিয়াজ আহমেদ নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘নির্দিষ্ট তারিখ দিয়েও হাসপাতাল উদ্বোধন না হওয়ায় আমরা আশাহত। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ ভালো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। উদ্বোধন পিছিয়ে যাওয়ায় আমাদের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হলো।’ হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘শুনলাম ফার্নিচার আসেনি বলে হাসপাতাল চালু হচ্ছে না। এই বিষয়টি তো কর্তৃপক্ষের অনেক আগেই তদারকি করা উচিত ছিল। আমাদের এখন সন্দেহ হচ্ছে আদৌ কি এই হাসপাতাল চালু হবে?’ যোগাযোগ করা হলে পিরোজপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ সম্পূর্ণ ঠিক করা হয়েছে। কিছু ফার্নিচার এসেছে, বাকিগুলো আসার প্রক্রিয়ায় আছে। সেগুলো সেটআপ করে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে উদ্বোধনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করব। ৩০ জুন সম্ভাব্য তারিখ থাকলেও এখন অধিকাংশ কাজ শেষ।’ পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ আমাদের ৩০ জুনের মধ্যে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু ফার্নিচার সরবরাহ ও আনুষঙ্গিক ফিনিশিংয়ের কাজের জন্য তারা আমাদের কাছে আরও ১৫ দিনের সময় চেয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সব ফার্নিচার চলে আসবে বলে আশা করছি। ফার্নিচার পাওয়া মাত্রই আমরা হাসপাতালটি চালু করব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘নতুন ভবনটি পুরোদমে চালু হলে চিকিৎসক ও জনবলের কিছুটা সংকট দেখা দিতে পারে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি এবং তারা দ্রুত জনবল সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী এবং পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় এই নতুন ভবনের অনেক কাজ ফেলে রাখা হয়েছিল। আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি, যার ফলে এখন দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আশা করছি, জুলাইয়ের মধ্যে আমরা হাসপাতালটির অন্তত তিনটি ফ্লোর চালু করতে পারব। আর অক্টোবরের মধ্যে লিফট চলে আসলে সেটিও চালু করে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া দেশজুড়ে নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে।’

আধুনিক এই হাসপাতালটি পুরোদমে চালু হলে পিরোজপুর জেলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘরের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব হবে এবং চিকিৎসা সেবার মান এক ধাপ এগিয়ে যাবেÑ এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।