স্পেনের আক্রমণের পর আক্রমণ, তারকাদের ঝলক আর পরিসংখ্যানের পাহাড় সবকিছুকে মিথ্যা প্রমাণ করে বিশ্বকাপ অভিষেকে ইতিহাস গড়ল কেপ ভার্দে। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ৪০ বছর বয়সি এক গোলরক্ষক, যার দুটি হাত হয়ে উঠেছিল একটি জাতির স্বপ্নের দেয়াল আর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সেই দুটি হাতের মালিক কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। ফুটবলের নতুন জাদুকরকে নিয়ে লিখেছেন ওমর ফারুক
ফুটবল মাঝে মাঝে এমন কিছু গল্প লেখে, যা পরিসংখ্যানের বইয়ে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। সেসব গল্পের নায়করা সবসময় সবচেয়ে বড় তারকা হন না, সবচেয়ে ধনী দেশের জার্সিও গায়ে থাকে না তাদের। তারা আসেন ছোট্ট কোনো শহর থেকে, কোনো উপেক্ষিত দেশ থেকে কিংবা পৃথিবীর মানচিত্রে প্রায় হারিয়ে যাওয়া কোনো দ্বীপপুঞ্জ থেকে। তারপর একদিন তারা বিশ্বমঞ্চে উঠে এসে এমন কিছু করে বসেন, যা পৃথিবীকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখায়, এই পৃথিবীতে অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই। আর ফুটবলে তো নেই-ই।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেই গল্পগুলোর অন্যতম হয়ে থাকবে কেপ ভার্দে ও স্পেনের মধ্যকার গোলশূন্য ড্র। স্কোরবোর্ডে হয়তো লেখা থাকবে ০-০। কিন্তু এই শূন্যের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ অর্জন, এক অদম্য প্রতিরোধ এবং এক মানুষের অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগের মহাকাব্য। সেই মহাকাব্যের প্রধান চরিত্রের নাম ভোজিনিয়া।
৪০ বছর বয়সি এই গোলরক্ষক হয়তো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত নাম নন। তার ক্যারিয়ারে বড় কোনো ইউরোপিয়ান ক্লাবের জার্সি নেই, নেই কোটি ডলারের চুক্তি। কিন্তু এক রাতেই তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বকাপের নতুন নায়ক। এমন এক নায়ক, যার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যর্থ হয়েছেন পেদ্রি, ফেরান তোরেস, ওইয়ারসাবাল, এমনকি ফুটবল বিশ্বের নতুন বিস্ময় লামিনে ইয়ামালও।
মজার ব্যাপার হলো, কয়েক ঘণ্টা আগেই চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি নবাগত কুরাসাওকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ম্যাচের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, স্পেনও হয়তো কেপ ভার্দেকে নিয়ে একই রকম গোল উৎসবে মাতবে।
কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, ফুটবল কখনোই কেবল শক্তির খেলা নয়, এটি হৃদয়েরও খেলা।
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা কেপ ভার্দে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি। জনসংখ্যা ছয় লাখেরও কম। মাত্র ১৯৭৫ সালে পর্তুগালের পাঁচ শতাব্দীর শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়া দেশটির ফুটবল অবকাঠামোও স্পেন, ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সঙ্গে তুলনা করার মতো নয়। তবুও তারা স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখে তারা।
অন্যদিকে স্পেন এসেছিল নিজেদের প্রমাণ করতে। একবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে। পাসিং ফুটবল, বলের দখল আর কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বে তাদের জুড়ি মেলা ভার।
ম্যাচ শুরুর পরও সেই দৃশ্যই দেখা গেল। বল যেন কেপ ভার্দের পায়ে যেতেই চাইছিল না। স্পেন নিজেদের মধ্যে একের পর এক পাস খেলছে, আক্রমণ গড়ছে, বক্সে ঢুকছে।
কিন্তু গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোজিনিয়াকে তারা যেন কোনোভাবেই পরাজিত করতে পারছিল না। প্রথমে ফেরান তোরেস। দারুণ এক শট নিয়েছিলেন তিনি। বল ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে ওইয়ারসাবালের হেড, সেখানেও ঝাঁপিয়ে পড়ে বল সরিয়ে দেন ভোজিনিয়া।
তারপর তোরেস আবার। আবারও ব্যর্থ। প্রথমার্ধের শেষ দিকে লাপোর্তের আক্রমণও আটকে যায় তার হাতে।
একের পর এক সেভ করতে করতে ভোজিনিয়া যেন ক্রমেই বড় হতে থাকেন। তার সামনে দাঁড়িয়ে স্পেনের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে মনে হচ্ছিল অসহায়।
ম্যাচের বিরতিতে স্কোরলাইন ০-০। কিন্তু এই শূন্য যেন কেপ ভার্দের কাছে এক বিশাল অর্জন। দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। আক্রমণের গতি বাড়ায়। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার শেষ অস্ত্র হিসেবে মাঠে নামান লামিনে ইয়ামালকে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সি এই বিস্ময়বালক মাঠে নেমেই নতুন রেকর্ড গড়েন। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে বড় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি।
কিন্তু ফুটবলের এই নতুন যুবরাজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেকজন, যার বয়স ৪০ বছর। নাম ভোজিনিয়া। দুজনের বয়সের পার্থক্য ২১ বছর ৪৫ দিন। একজন ভবিষ্যতের প্রতিনিধি, অন্যজন অভিজ্ঞতার প্রতীক।
ইয়ামাল তার স্বাভাবিক ড্রিবল করেছেন, গতি দেখিয়েছেন, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। কিন্তু ভোজিনিয়া ও তার রক্ষণভাগকে ভাঙা যায়নি। প্রতিটি মিনিটের সঙ্গে সঙ্গে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের চোখে ভয়ের জায়গা দখল করে নেয় আত্মবিশ্বাস।
স্পেনের খেলোয়াড়দের চোখে তখন বাড়তে থাকে হতাশা। ৮৬ মিনিটে রদ্রি দূরপাল্লার এক শট নেন। বল অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। স্পেনের অস্থিরতা তখন স্পষ্ট। কিন্তু সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে ৮৮ মিনিটে। ওইয়ারসাবাল যখন নিশ্চিত গোলের জন্য পা বাড়িয়েছেন, ঠিক তখন কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার পিকো লোপেস নিজের শরীরকে বলের সামনে ছুড়ে দেন। মাথা দিয়ে বল ক্লিয়ার করেন। এ যেন কেবল একটি ক্লিয়ারেন্স নয়। এ যেন একটি জাতির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা। গ্যালারিতে থাকা কেপ ভার্দের সমর্থকরা তখন কাঁদছেন। মাঠে খেলোয়াড়রা দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছেন। আর গোলপোস্টের নিচে ভোজিনিয়া এখনো অটল। যোগ করা সময়ে কেপ ভার্দের সামনে এসেছিল রূপকথা সম্পূর্ণ করার সুযোগও। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে কেভিনের শট, তারপর কর্নার। এক মুহূর্তের জন্য পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। যদি গোল হয়ে যায়? যদি ছোট্ট কেপ ভার্দে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই স্পেনকে হারিয়ে দেয়? সেই অলৌকিক মুহূর্তটি আর আসেনি। কিন্তু তাতে গল্পের সৌন্দর্য একটুও কমেনি।
কারণ কেপ ভার্দে বুঝিয়ে দিয়েছে, জয় মানেই সবসময় তিন পয়েন্ট নয়। কখনো কখনো ড্র-ও হয়ে ওঠে বিজয়ের চেয়েও বড়। যে ম্যাচে স্পেন ৭৪ শতাংশ বলের দখল রেখেছে, ৮০১টি পাস খেলেছে, ২৭টি শট নিয়েছেÑ সেই ম্যাচ শেষে উল্লাস করেছে কেপ ভার্দে। কারণ তারা কেবল একটি পয়েন্ট অর্জন করেনি। তারা অর্জন করেছে সম্মান। অর্জন করেছে পৃথিবীর কোটি মানুষের ভালোবাসা। আর ভোজিনিয়া? তিনি হয়তো এই বিশ্বকাপে আর কখনো এমন ম্যাচ খেলবেন না। হয়তো এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রাত। কিন্তু তাতে কী? ফুটবলের ইতিহাসে কিছু রাত থাকে, যা কোনো ট্রফি ছাড়াই অমর হয়ে যায়। আটলান্টার সেই রাতও তেমনই।
যেখানে এক ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক নিজের দুটি হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন স্পেনের সব স্বপ্ন, আর নিজের চোখের অশ্রু দিয়ে লিখেছিলেন একটি ছোট্ট দেশের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহাকাব্য।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন