× UCB Sticker Card
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

 ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

গৌরবের শিখর থেকে সময়ের কাঠগড়ায়

 ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

গৌরবের শিখর থেকে সময়ের কাঠগড়ায়

সময় বড় নির্মম। কাউকে ছাড় দেয় না। রাজা, সম্রাট, বীর কিংবা কিংবদন্তি, সবাইকে একদিন তার সামনে দাঁড়াতে হয়। অথচ কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের দেখে মনে হয় সময়ও যেন তাদের স্পর্শ করতে ভয় পায়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ছিলেন তেমনই এক নাম। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করা এই মহাতারকা যেন মানুষ নন, এক অবিনশ্বর শক্তির প্রতীক। বয়স বাড়ছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে, প্রজন্ম বদলাচ্ছে, কিন্তু রোনালদো যেন অটুট ছিলেন নিজের উচ্চতায়। তবু একদিন না একদিন সময় তার হিসাব চুকিয়ে নেয়।

২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্র সেই হিসাবেরই যেন এক বিষণœ স্মারক হয়ে ধরা দিল। ম্যাচ শেষে স্কোর বোর্ডে হয়তো একটি ড্র লেখা ছিল, কিন্তু সেই ড্রয়ের ভেতরে লুকিয়ে ছিল আরও বড় এক প্রশ্ন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কি এখনো পর্তুগালের স্বপ্নের শেষ আশ্রয়, নাকি তিনি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছেন নিজেরই গড়া কিংবদন্তির ছায়ায়?

এক সময় পৃথিবীর কোনো ডিফেন্ডার তার সামনে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন না। তার পায়ের গতি ছিল বজ্রের মতো, আকাশে লাফ ছিল ঈগলের মতো আর গোল করার ক্ষুধা ছিল যেন অন্তহীন। তিনি বল পেলে গ্যালারিতে একটা অদৃশ্য কম্পন ছড়িয়ে পড়ত। দর্শক জানত, অসম্ভব কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কারণ মাঠে তখন ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

মাদেইরার এক দরিদ্র পরিবারের ছোট্ট ছেলেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চগুলো জয় করেছিলেন নিজের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা আর অদম্য মানসিক শক্তি দিয়ে। তিনি শুধু গোল করেননি, তিনি মানুষের বিশ্বাস বদলে দিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন, প্রতিভা জন্মগত হতে পারে, কিন্তু কিংবদন্তি হতে হলে প্রয়োজন অমানুষিক পরিশ্রম।

সেই মানুষটিকেই কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে দেখা গেল অসহায়ভাবে সুযোগের অপেক্ষা করতে। পুরো ম্যাচে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেছেন। একবারও প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে পরীক্ষা করতে পারেননি। মাঝেমধ্যে তাকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি যেন বলের জন্য অপেক্ষা করছেন; অথচ এক সময় বলই তাকে খুঁজে নিত।

যে মানুষটি একসময় পুরো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, আজ তিনি যেন ম্যাচের গতির সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছেন। এ যেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। পরিসংখ্যান আরও কঠিন কথা বলছে। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচে গোল নেই। বড় আন্তর্জাতিক আসরে গত পাঁচ বছরে পেনাল্টি ছাড়া গোল নেই বললেই চলে। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ তাই প্রশ্ন তুলছে, পর্তুগালের স্বার্থে কি এখন নতুন কাউকে জায়গা করে দেওয়ার সময় আসেনি?

প্রশ্নটি কঠিন হতে পারে। কিন্তু অযৌক্তিক নয়। কারণ ফুটবল আবেগের খেলা হলেও, শেষ পর্যন্ত এটি বাস্তবতারই খেলা। মাঠে অতীতের সাফল্য নয়, বর্তমানের সামর্থ্যই মূল্য পায়। আর সময়ের এই নির্মম পরীক্ষায় অনেক কিংবদন্তিকেও একদিন হার মানতে হয়েছে। কিন্তু রোনালদো কি শুধুই একজন ফুটবলার? তিনি তো একটি যুগের নাম। যে প্রজন্ম তার বাইসাইকেল কিক দেখে বিস্ময়ে চিৎকার করেছে, যে প্রজন্ম তার চোখের জল দেখে কেঁদেছে, যে প্রজন্ম তার ট্রফি জয়ের উল্লাসে রাত জেগেছে, তাদের কাছে রোনালদো কেবল একজন খেলোয়াড় নন। তিনি অনুপ্রেরণা, আত্মবিশ্বাস আর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জীবন্ত প্রতীক। তাই তার ব্যর্থতাও যেন সাধারণ ব্যর্থতা নয়। যখন তিনি গোল মিস করেন, তখন শুধু একটি সুযোগ নষ্ট হয় না; কোটি ভক্তের বুকেও যেন হালকা একটা ব্যথা জন্ম নেয়। কারণ তারা জানেন, এই মানুষটিই একদিন সব অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন।

তবুও ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই, এখানে কেউ চিরকাল শীর্ষে থাকে না। পেলে নেমেছেন। ম্যারাডোনা নেমেছেন। জিদান নেমেছেন। রোনালদোকেও একদিন নেমে যেতে হবে। কিন্তু সব বিদায় একরকম হয় না। কিছু বিদায় হয় নিঃশব্দে, আবার কিছু বিদায় হয়ে ওঠে মহাকাব্য। কোটি ভক্তের প্রত্যাশা রোনালদোর বিদায় নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টির মতোই হবে। কারণ তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি পরাজয়ের মাঝেও লড়াই চালিয়ে যেতে জানেন। বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু তার চোখের আগুন এখনো নিভে যায়নি। তার শরীর হয়তো আগের মতো সাড়া দেয় না, কিন্তু জয়ের ক্ষুধা এখনো আগের মতোই তীব্র। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ তাই আস্থা হারাননি। কারণ তিনি জানেন, ইতিহাসের সেরা গোলদাতারা কখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যান না। তারা হয়তো দীর্ঘ সময় নীরব থাকেন, কিন্তু একটি মুহূর্তেই আবার জ্বলে উঠতে পারেন। হয়তো আগামী ম্যাচেই রোনালদো গোল করবেন। হয়তো আবারও তার বিখ্যাত উদযাপনে মুখর হবে গ্যালারি। হয়তো সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেবেন এক ঝলক আলোয়। আবার এটাও হতে পারে, ২০২৬ বিশ্বকাপই হয়ে থাকবে তার শেষ মহাযুদ্ধের মঞ্চ, যেখানে তিনি লড়বেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়, বরং নিজের অতীতের সঙ্গে। কারণ সবচেয়ে কঠিন লড়াই কখনো বাইরের কারও সঙ্গে হয় না। সবচেয়ে কঠিন লড়াই হয় নিজের কিংবদন্তির সঙ্গে। আর সেই লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে আজও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো মাথা নত করেননি। সময়ের চোখে চোখ রেখে তিনি এখনো বলে চলেছেন, আমি শেষ হয়ে যাইনি। কিন্তু সময়? সে শুধু নীরবে অপেক্ষা করছে, একটি যুগের শেষ দৃশ্য দেখার জন্য।

তবুও বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বয়স ৪১। শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাটা এখন আর শুধু প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়, বরং নিজের অতীতের বিপক্ষেও। এক সময় যিনি ছিলেন গতির প্রতীক, তাকে এখন লড়তে হচ্ছে স্মৃতির সঙ্গে; এক সময় যিনি ছিলেন ভবিষ্যৎ, তিনি এখন নিজের উত্তরাধিকার রক্ষার যুদ্ধে নেমেছেন। বিশ্বকাপের পথ এখনো অনেক বাকি। হয়তো সামনের কোনো ম্যাচে আবারও জ্বলে উঠবেন রোনালদো, সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেবেন এক গোলেই। আবার এটাও হতে পারে, এই বিশ্বকাপই হয়ে থাকবে এক যুগের শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী।

কারণ, কিংবদন্তিরা হঠাৎ করে হারিয়ে যান না। তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গল্পটি শুধু গোলের নয়, এক মহাতারকার সময়ের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের গল্প।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!