ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬

স্পেনের সামনে আল্পসের প্রাচীর

 রুহুল আমিন ভূঁইয়া
প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম

বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই ভাগ্যের নতুন পরীক্ষা। এখানে অতীতের সাফল্য কিংবা র?্যাঙ্কিং কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। একটি ভুল, একটি মুহূর্ত কিংবা একটি অসাধারণ গোলই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের গল্প। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ স্পেন ও অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি লড়াইও তেমনই এক প্রতীক্ষিত মহারণ।

একদিকে চারবারের ইউরোপসেরা এবং ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত উন্নতি করা অস্ট্রিয়া, যারা নিজেদের সংগঠিত ফুটবল দিয়ে ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলোর জন্যও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। তাই এই ম্যাচটি কেবল দুই দলের লড়াই নয়, এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। গ্রুপ পর্বে স্পেন তাদের স্বাভাবিক ছন্দেই খেলেছে। বলের দখল, দ্রুত পাসিং, আক্রমণে বৈচিত্র্য এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণÑ সব মিলিয়ে তারা ছিল অন্যতম পরিপূর্ণ দল। প্রতিপক্ষকে খুব কমই সুযোগ দিয়েছে, আবার নিজেরাও ধারাবাহিকভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করেছে।

অস্ট্রিয়ার গল্পটা ছিল কিছুটা ভিন্ন। খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলেই নকআউট নিশ্চিত করেছে। শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষেও ভয় না পেয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলগত সমন্বয় এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা।

স্পেনের ফুটবলকে অনেকেই শিল্পের সঙ্গে তুলনা করেন। একের পর এক ছোট পাস, ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে তোলা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলাÑ এটাই তাদের পরিচিত দর্শন। এই বিশ্বকাপে সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের গতি। লামিন ইয়ামাল যেন প্রতিটি ম্যাচেই নতুন কিছু উপহার দিচ্ছেন। ডান প্রান্ত দিয়ে তার দৌড়, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং সাহসী সিদ্ধান্ত প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার বিপদে ফেলেছে।

মাঝমাঠে পেদ্রি খেলাকে এগিয়ে নিয়ে যান, আর রদ্রি পুরো দলের ভারসাম্য ধরে রাখেন। সামনে অভিজ্ঞ আলভারো মোরাতা সুযোগ পেলেই গোল করার সামর্থ্য রাখেন। ফলে স্পেনের আক্রমণ এখন অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের দুর্দান্ত মিশেল।

অস্ট্রিয়ার ফুটবল চোখ ধাঁধানো নাও হতে পারে, কিন্তু কার্যকারিতার দিক থেকে তারা অসাধারণ। কোচ রালফ রাংনিকের অধীনে দলটি এখন উচ্চগতির প্রেসিং, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার এবং পাল্টা আক্রমণে ইউরোপের অন্যতম সফল দল। মার্সেল সাবিৎসারের নেতৃত্ব, কনরাড লাইমারের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং রক্ষণে ফিলিপ লিনহার্টদের দৃঢ়তা অস্ট্রিয়াকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দলে পরিণত করেছে। সুযোগ পেলেই তারা কয়েকটি পাসে প্রতিপক্ষের বক্সে পৌঁছে যেতে পারে।

এই ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে মাঝমাঠে। স্পেন চাইবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে, আর অস্ট্রিয়া চাইবে সেই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিতে।

রদ্রি ও পেদ্রির বিপক্ষে সাবিৎসার ও লাইমারের দ্বৈরথই ম্যাচের গতি নির্ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে লামিন ইয়ামালকে থামানোর দায়িত্ব থাকবে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগের ওপর। যদি ইয়ামাল নিজের ছন্দে খেলতে পারেন, তাহলে স্পেনের আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে উঠবে।

স্পেনের বর্তমান দলটি নতুন প্রজন্মের প্রতিভায় ভরপুর। ইয়ামাল, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামসদের গতি ও সৃজনশীলতা প্রতিটি ম্যাচেই পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার শক্তি তাদের অভিজ্ঞতা ও দলগত বোঝাপড়া। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দল হিসেবে কীভাবে ম্যাচ জিততে হয়, সেটিই তারা সবচেয়ে ভালো জানে। স্পেন শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে খেলবে এবং প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখার চেষ্টা করবে। দুই উইং ব্যবহার করে তারা আক্রমণের চাপ বাড়াবে। অস্ট্রিয়া অপেক্ষা করবে প্রতিআক্রমণের সুযোগের। স্পেনের ডিফেন্ডাররা যখন ওপরে উঠে আসবেন, তখন সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে তারা। ম্যাচ যত দীর্ঘ হবে, অস্ট্রিয়ার আত্মবিশ্বাসও তত বাড়বে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পরিসংখ্যানের চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের আছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা, অসাধারণ কারিগরি দক্ষতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিভা। অস্ট্রিয়ার আছে শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস এবং বড় দলকে চমকে দেওয়ার সাহস। ৪ জুলাইয়ের রাতে তাই শুধু একটি দল শেষ ষোলোয় উঠবে না; বিশ্ব ফুটবল পাবে নতুন একটি গল্প।