ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

রাজনৈতিক ছাড়ের আশায় আ.লীগ

ফারুক আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২৬, ০৫:৩০ এএম

২০২৪ এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। নির্বাসনে থেকে বিভিন্ন সময়ে অডিও বার্তায় নানা হুংকারসহ দলের কর্মীদের বড় ধরনের আন্দোলনের নির্দেশ দেন তিনি। যদিও নেতৃত্বস্থানীয় বেশির ভাগ নেতা দেশের বাইরে পালাতক রয়েছেন, এতে সাংগঠনিক নির্দেশনা না থাকায় দিকভ্রান্ত হচ্ছেন দলটির কর্মীরা। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, সাংগঠনিক কাঠামো ফেরানোর সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় ক্ষমা চেয়েই রাজনীতিতে সক্রিয় হতে হবে। দলের সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া হুংকার বা দম্ভ দেখিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ নেই। বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

এদিকে বিভিন্ন সময়ে ফাঁস হওয়া অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারিসহ দেশে ফেরার বিষয়ে মন্তব্য করছেন। অচিরেই দেশে ফিরবেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে কর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশও দিচ্ছেন। যদিও বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন বলে মনে করেন খোদ দলের নেতাকর্মীরাই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লুটপাট, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিজম কায়েমের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি পারিবারিক শাসন কায়েম করেছিল। এদিকে জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তিত পেক্ষাপটে দলটির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। অনেকেই বিদেশে চলে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব শূন্য দলটির রাজনীতিতে ফেরার কোনো অবস্থা এখনো সৃষ্টি হয়নি।

তবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, বাইরের কোনো শক্তি দলটিকে আবারও ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এই আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ঝটিকা মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। গতকাল শনিবারও মিছিলের একটি ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তথ্য পাওয়া যায়, রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের মোহনপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে রাজবাড়ীমুখী হয়ে মিছিলটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে এমন ঘটনায় গ্রেপ্তারও হচ্ছে উৎসাহী নেতারা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আব্দুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জানান, বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর কিছুটা স্বস্তি দেখছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

যদিও স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে ফিরতে ক্ষমতাসীন দলের ‘রাজনৈতিক ছাড়’-এর অপেক্ষায় করা হচ্ছে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই মুহূর্তে অপেক্ষা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ছাড়া অন্য কোনো কৌশল নিচ্ছে না। জোর করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার মতো পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি, এটাই বাস্তবতা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রত্যাশা : গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যাশা, একটি রাজনৈতিক সরকার অরাজনৈতিক সরকারের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তবে কবে বা আদৌ তা হবে কি না তা নিশ্চিত নয়। দলটির একাধিক নেতারা বলছেন, বিএনপি সরকারের মনোভাব ও অবস্থানের ওপরই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কার্যক্রম নির্ভর করছে।

রাজনীতিতে ফিরতে কৌশল : আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার দেওয়া তথ্য মতে, সহিংসতা বা মুখোমুখি সংঘাতে না গিয়ে ধীরে ধীরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। যেগুলোর ভিত্তিতে নানামুখী কর্মসূচি নিচ্ছে দলটি। তবে এসবই নির্ভর করছে সরকারের অবস্থানের ওপর। কোনো উসকানিমূলক বা উত্তেজনাপূর্ণ কর্মসূচি আপাতত বিবেচনায় নেই বলে জানিয়েছেন নেতারা।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আ.লীগ ক্ষমতায় ছিল অনেক বছর, আইন করে কি দলটিকে মুছে ফেলা কষ্টকর। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত নির্বাচনে দিলে ভোটাররাই আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করতেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার নানা টালবাহানা করে দেড় বছর পার করে দিয়ে নির্বাচন দেওয়ায় আওয়ামী লীগ অনেকটাই জীবন ফিরে পেয়েছে।

মাঝেমধ্যে ‘রিফাইনড আওয়ামী লীগের’ কথা শোনা যায়। কে কে নেতৃত্ব দিতে পারেন, এ রকম কিছু নাম বাতাসে ভেসে বেড়ায়। খোদ দলের নেতারা বলেন, শেখ হাসিনা দলের সভাপতির পদ ছাড়বেন না। কারণ তার ক্ষমতার উৎস হচ্ছে বর্তমান পদ। তিনি পদ ছাড়লে দলে জায়গা থাকে না। সে জন্য আওয়ামী লীগ ফিরলে হাসিনাকে নিয়েই ফেরার চেষ্টা করবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি সম্ভব নয়।

তৎপরতা শুরু : নির্বাচনের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের কিছু কার্যালয় খোলা হয়েছে। কোথাও কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং শহিদ দিবসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচিও পালন করছে। তবে এসব উদ্যোগের মাঝেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ঝটিকা মিছিল থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। যাতে দলটির মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। ফলে বড় ধরনের কর্মসূচি ঘোষণার আগে পরিস্থিতি আরও পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের বক্তব্য ও প্রাথমিক পদক্ষেপকে তারা ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছেন। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারবে, এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। তবে একই সঙ্গে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তাও রয়েছে। কার্যালয় খোলা বা সীমিত কর্মসূচির পরও কোথাও কোথাও হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটায় দ্রুত ছাড় মিলবে, এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না নেতারা।

ফিরে আসতে অপেক্ষা : হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কথা হয় সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে জানান, রাজনৈতিক সরকারের কাছে রাজনৈতিক আচরণই প্রত্যাশা করি। তবে এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি বুঝে এগোতে হবে। সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের বর্তমান কৌশলÑ সংঘাত এড়িয়ে ধৈর্য ধরা এবং বিএনপি সরকারের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকা-ে ফিরতে তারা ক্ষমতাসীন দলের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে।