ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

উপযুক্ত পদায়নের অপেক্ষায় বিএনপির ত্যাগীরা

সিলেটের সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩ শীর্ষ পদে হেভিওয়েট নেতা

সিলেট ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২৬, ০৫:৩২ এএম

কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সারা দেশের মতো সিলেটেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে যোগ্য ও রাজনৈতিক ত্যাগী নেতাদের পদায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। সরাসরি বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে¡ নিয়ে আসা হচ্ছে রাজপথের পরীক্ষিত মুখগুলোকে।

ইতিমধ্যেই সিলেটের তিনটি শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপির তিন হেভিওয়েট নেতাকে পদায়ন করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। একই সাথে তাকে করা হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক। বিসিবি নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে ক্যাটাগরি-১ (জেলা ও বিভাগীয় কোটা) এর অধীনে প্রার্থী হয়েছিলেন। সিলেট বিভাগ থেকে অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় গত জুন মাসের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচিত হন।

গেল মার্চ মাসে সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীমকে। চলতি বছরের ১১ জুন সরকারের গ্রেড-২ পদমর্যাদায় ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (সিউক)-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের বারবার নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং আরিফুল হক চৌধুরীর আমলে প্যানেল মেয়র-১ এর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

সংসদ সদস্য এবং পরবর্তীতে সরকারে মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে সিলেটের শীর্ষ নেতাদের। পরবর্তীতে সিলেটের প্রধান তিন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ চেয়ারে বসানো হয় জেলা ও মহানগরের তিন নেতাকে। এরপর সিলেটের রাজনৈতিক মহলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই, পরের ধাপে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা, বোর্ড ও স্থানীয় উন্নয়ন কমিটিতে বাকি ত্যাগী নেতাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? তৃণমূলের বড় অংশই মনে করছেন, সিলেটের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ ও জনপ্রিয় নেতা এখনো উপযুক্ত পদায়নের অপেক্ষায় ‘ওয়েটিং লিস্টে’ আছেন।

সিলেটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় কর্মীদের মতে, আন্দোলনের মাঠে যারা সরাসরি বুলেটের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য, তাদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় বসানো এখন সময়ের দাবি। এই তালিকায় অগ্রভাগে আছেন চার শীর্ষ নেতা, তাদের শীর্ষে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনের রাজপথে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া ২৪-এর জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে আহত হন এই নেতা। ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এই নেতা চেয়েছিলেন সিলেট-৪ সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়ন। কিন্তু তা ভাগিয়ে নিয়ে এখন মন্ত্রণালয়ে জায়গা করে নিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। মিফতাহ ছিলেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক। তাকে সিলেটের কোনো মেগা প্রজেক্ট বা গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড/কর্তৃপক্ষের শীর্ষ দায়িত্বে দেখতে চান সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা। ধারণা করা হচ্ছে, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে তাকে মনোনয়ন দিয়ে মূল্যায়িত করা হতে পারে।

এরপরের তালিকায় আছেন, বদরুজ্জামান সেলিম। তিনি মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। কর্মীরা তাকে সিলেটের কোনো বড় রাষ্ট্রীয় বা নীতি-নির্ধারণী সংস্থায় মূল্যায়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনিও সিলেট-৪ সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

মূল্যায়নের তালিকায় আছেন মহানগর বিএনপি সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী। চরম দুর্যোগকালে যিনি সিলেট মহানগর বিএনপির হাল ধরেছেন এবং সিলেটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দল গোছাতে চষে বেড়াচ্ছেন, তাকেও সরকারের কোনো বড় দায়িত্বে পদায়নের জোরালো দাবি রয়েছে।

আরও আছেন আব্দুল কাইয়ুম জালালী পঙ্খী। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর। তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই রাজনীতি পাগল নেতার অতীত অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কোনো স্থানীয় সরকারি বোর্ডের দায়িত্বে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করেন তার সমর্থকরা।

রাজনৈতিক সূত্র জানায়, সিলেট সিটি, জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পদায়ন শেষ হলেও সিলেটে এখনো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, বোর্ড ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা রয়েছে, যেখানে সরকার সাধারণত বিশিষ্ট নাগরিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদায়ন করে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম সিলেট গ্যাসেস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) ও জালালাবাদ গ্যাস। সিলেটের এই বৃহৎ দুটি জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড অব ডিরেক্টরস) চেয়ারম্যান বা অ-প্রশাসনিক স্বাধীন পরিচালক হিসেবে সিলেটের শীর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পদায়নের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটিও। সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রের ‘হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সভাপতি বা গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদে সাধারণত স্থানীয় শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা সরাসরি জনসেবার সাথে সম্পৃক্ত।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন গভর্নিং বডি এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে শিক্ষানুরাগী ও প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের প্যানেলভুক্ত করার রেওয়াজ আছে। বাকি আছে সিলেট চেম্বার অব কমার্স ও সরকারি বাণিজ্যিক উইং। সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য গঠিত বিভিন্ন সরকারি লিয়াজোঁ কমিটি ও বাণিজ্যিক উইংয়ের শীর্ষ পদে অভিজ্ঞ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়াও জাতীয় যুব উন্নয়ন কমিটি, সমাজসেবা অধিদপ্তরের জেলা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতো বড় মানবিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ কমিটি পুনর্গঠন করে সেখানে এসব নেতাদের যোগ্য স্থান দেওয়া হতে পারে।