উত্তরের জেলা রংপুরের মাটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমিতে উর্বরতার ঘাটতি প্রতিদিন বাড়ছে। অন্যদিকে গৃহপালিত প্রাণীদের অসুস্থতাও ভাবিয়ে তুলছে কৃষকদের।
সেই ভাবনা থেকে মাটির উর্বরতা ঘাটতি পূরণে দেশি গরুর গোবর থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছেন এক তরুণ উদ্যোক্তা। একই সঙ্গে গৃহপালিত পশুদের সুচিকিৎসা দিয়ে কষকদের স্বস্তি দিচ্ছেন গঙ্গাচড়া উপজেলার যুবক মো. ফজলে রাব্বী (তুহিন)।
সর্বগ্রাহী তিস্তার পাড়ে তিনি প্রাণী চিকিৎসক। একাধারে ভার্মি কম্পোস্ট/কেঁচো সার উৎপাদন ও বিপণন করে মাটির ডাক্তার হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন তুহিন। প্রতি মাসে চাহিদা ১৫ টন থাকলেও প্রায় ১০ টন উৎপাদন ও বিপণন করেন তিনি।
গঙ্গাচড়া উপজেলায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার ১২১ হেক্টর। উপজেলায় ধান, আলু, গম, ভুট্টা ও পানসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসল উৎপাদন করেন কৃষক। এসব জমি চাষাবাদে রাসায়নিক সারের বার্ষিক মোট চাহিদার পরিমাণ ১৬ হাজার ৪৬৮ মেট্রিক টন। তবে কম্পোস্ট সারের চাহিদার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি বিভাগ।
উপজেলার উত্তর পানাপুকুর গ্রামে নিজস্ব শেডে মাঝারি শিল্প আকারে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন ফজলে রাব্বী (তুহিন)। তিনি বলেন, উপজেলায় আরও চারজন এই সার উৎপাদন করছেন, তবু চাহিদার তুলনায় অনেক কম। কারণ তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কোম্পানি, কৃষি উদ্যোক্তা ও বাগানপ্রেমীরা এই সার কিনছেন। এসব সার ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠান এবং ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করেন তারা।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে কৃষিখাত, প্রকৃতি ও পরিবেশ নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে। জমিতে উর্বরতার ঘাটতির কারণে কমছে উৎপাদন। ফলে তিন ফসলি জমির মাটি বা টপ সয়েল বিক্রির প্রবণতা উত্তরাঞ্চলে। এসব জমির টপ সয়েল তুলে নেওয়ার পরে সেখানে ব্যবহার করা হয় কম্পোস্ট সার,
যার কারণে তিস্তা নদীবিধৌত এই অঞ্চলে ভার্মি কম্পোস্ট/কেঁচো সারের ব্যবহার বাড়ছে। অতিমূল্যের রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে দেশি গরুর গোবর থেকে উৎপাদিত এই সার ব্যবহার করছেন কৃষক। উপজেলায় ১০ বছর আগে প্রায় ৩২ জন উদ্যোক্তা ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এখন উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন সেই উদ্যোক্তারা।
উৎপাদন বন্ধ রাখা উদ্যোক্তা হলেনÑ গঙ্গাচড়া সদরের আলী আখতার নাহিদ, মো. ইলিয়াস রহমান, রিপন মিয়া ও মো. রুকসানা আখতারসহ অনেকে। তাদের মধ্যে সমস্যা তুলে ধরে তরুণ উদ্যোক্তা আলী আখতার নাহিদ বলেন, ‘বেসরকারি চাকরি করায় এখন উৎপাদনে সময় দিতে পারছি না। অন্যদিকে, কৃষিশ্রমিকের সংকট এবং পরিবেশগত সমস্যা তো রয়েছেই। কারণ গঙ্গাচড়া বন্দরের ভেতরে বাসা হওয়ায় গোবর ব্যবহারে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।’
সরকারি সুবিধা সম্পর্কে উপজেলা কৃষি বিভাগ নিয়ে অভিযোগ করেন আলী আখতার নাহিদ। তিনি বলেন, ‘এক দিনের ট্রেনিং এবং একটি সাইনবোর্ড দিয়েছে। দীর্ঘ আট বছরে এর বাইরে কোনো সহায়তা নেই, খোঁজও রাখেন না তারা।’
‘গোবর থেকে তৈরি হওয়ায় মুনাফা আছে’ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমার শেড তৈরি করা আছে, আগামীতে অন্য কোনো স্থানে খোলা পরিবেশে বড় পরিসরে শুরু করব।’
বর্তমানে উপজেলায় মাত্র পাঁচজন উদ্যোক্তা কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। তারা হলেনÑ তুহিনসহ থানাপাড়ার মো. শামীম মিয়া, ঠাকুরাদহ গ্রামের মো. ওয়ালিদ হাসান ও জুয়েল রানা, বোল্লারপাড় গ্রামের রিপন মিয়া।
চাষিরা বলেন, পান, সবজি চাষ, বাগান এবং ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য এই সার দারুণ কার্যকরী। অন্যদিকে রাসায়নিক সারের বিপরীতে দাম কম এবং বালাইনাশকের ব্যবহারও কম করতে হয়।
প্রতি মাসে ১০ টন উৎপাদন ও বিপণন করে স্বাবলম্বী হওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী উত্তর পানাপুকুরের যুবক ফজলে রাব্বী বলেন, ‘প্রায় আট বছর আগে ছোট পরিসরে শুরু হয় উৎপাদন। এখন বড় আকারে শুরু করে বছরে প্রায় ১২০ টনের অধিক কম্পোস্ট সার উৎপাদন হচ্ছে।’ প্রতি মাসে তার চাহিদা ১৫ টন, মাসে ৫০-৬০ জন কৃষককে সরবরাহ করেন তিনি। প্রতি কেজি সারের দাম মাত্র ১৫ টাকা।
এ ছাড়া ফোনে অর্ডার নিয়ে অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে গ্রামের বাড়ি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাকযোগে সার পাঠান তিনি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণি চিকিৎসক হিসেবে তুহিন বলেন, ‘প্রায় ৫০ জন বেকার যুবক ও যুব নারীকে সার উৎপাদনের প্রক্রিয়া শিখিয়েছি। তারা যেন নিজের জমিতে ব্যবহার করেন এবং অতিরিক্ত সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন। গৃহপালিত প্রাণি চিকিৎসা সম্পর্কেও তাদের ধারণা দিই, যাতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিজেরা দিতে পারেন।’
এদিকে, উপজেলায় ‘কম্পোস্ট সার উৎপাদনকারীর সঠিক তালিকা নেই’ বলে জানান গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুবেল হুসেন। সদ্য যোগদানকারী হিসেবে তিনি বলেন, ‘রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসাবে জৈব সার কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কম্পোস্ট সারের চাহিদার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।’
উপজেলায় রাসায়নিক সার হিসেবে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৮ হাজার ১৯১ টন, টিএসপির চাহিদা ২ হাজার ৬৯৩ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ৪ হাজার ১৮৪ টন মিলে মোট ১৬ হাজার ৪৬৮ মেট্রিক টন সারের চাহিদা রয়েছে বলে জানান রুবেল হুসেন।
তরুণ উদ্যোক্তাদের সরকারি সহযোগিতা সম্পর্কে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগ নেই। আগামীতে সুযোগ এলে অবশ্যই তারা পাবেন।’ বলেন কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন।

