ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজারো মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্ধারকর্মী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। কম্পনের তীব্রতায় রাজধানী কারাকাস এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য বহুতল ভবন, হাসপাতাল, সরকারি স্থাপনা ও আবাসিক ভবন মুহূর্তেই ধসে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর কাছের উপকূলীয় লা গুইরা অঞ্চল। সেখানে বহু ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, এটি অত্যন্ত জটিল মানবিক বিপর্যয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকে থাকতে পারেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি হিসাবে অন্তত ২০০ জন জীবিত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন। তবে উদ্ধারকাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। পর্যাপ্ত ভারী যন্ত্রপাতির অভাব, ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় স্বজন, প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজ করছেন।
লা গুইরার একটি বহুতল আবাসিক এলাকায় আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীদল কাজ শুরু করেছে। চারটি বহুতল ভবন পুরোপুরি ধসে পড়ায় শত শত পরিবার নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধারকারীদের ভাষ্য, জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা দ্রুত কমে আসছে। এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার এবং আটকে পড়াদের অবস্থান শনাক্ত করা।
ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সময়মতো সরকারি সহায়তা না পৌঁছানোয় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়েছে। পাঁচ মাস বয়সি সন্তানকে খুঁজতে থাকা এক মা জানান, নিজের শিশুসন্তান এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের কোনো খোঁজ এখনো পাননি। ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ এগোচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
কারাকাসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান দেলসি রদ্রিগেজের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকারের উদ্ধার তৎপরতা পর্যাপ্ত নয় এবং বহু মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে অসহায় অবস্থায় পড়ে আছেন।
ভয়াবহ এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই কয়েকটি এলাকায় লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। দোকান, ওষুধের দোকান, বিপণিবিতান, এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর থেকেও খাদ্য, ওষুধ ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমিত উপস্থিতির সুযোগে এসব ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। যদিও অনেকের দাবি, চরম খাদ্যসংকট ও বেঁচে থাকার তাগিদেই তারা এমন কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থার সমন্বয়ে অন্তত ১৭টি দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারীদল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। স্পেন, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, এল সালভাদরসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর এবং বিশেষ যন্ত্রপাতিও আনা হয়েছে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রও উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি আড়াই শতাধিক সদস্যের একটি বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলাদল পাঠানোর পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানের সমন্বয়ের জন্য একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে কারাকাসে পাঠিয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং উদ্ধার সরঞ্জাম দ্রুত দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। ১৯০০ সালের পর এটিই দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এর আগে ১৯৯৭ সালের পর এত বড় মাত্রার ভূমিকম্প সেখানে আর আঘাত হানেনি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বহু হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মানুষ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকটও দ্রুত প্রকট হচ্ছে।
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। পর্তুগাল, স্পেন, ব্রাজিল, চীন, চিলি ও ইতালির কয়েকজন নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া শতাধিক বিদেশি নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জানিয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার না করা হলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ অচিরেই আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

