আবাসিক খাতে গ্যাসের অপচয় কমানো, অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সিস্টেম লস হ্রাস এবং ব্যবহারভিত্তিক বিলিং নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নেওয়া স্মার্ট প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের একাধিক বড় প্রকল্প স্থগিত করেছে সরকার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৬ হাজার ৪৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্পের আওতায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার নতুন স্মার্ট গ্যাস মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। তবে চলমান প্রকল্পগুলো হঠাৎ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ¦ালানি বিভাগ। এতে করে গ্যাস খাতে সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
চলতি বছরের এপ্রিলে পেট্রোবাংলার আওতাধীন কোম্পানীগুলোর অধীনে বাস্তবায়নাধীন বিশ^ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট (এডিবি)’র অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন তিনটি স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্প ও প্রস্তাবিত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ গ্যাস নেটওয়ার্ক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আবাসিক সংযোগের বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, স্মার্ট মিটার ক্রয়ের জন্য বৈদেশিক ঋণ, দেশীয় গ্যাসের ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক সংশ্লেষ, স্মার্ট মিটারের মাসিক ভাড়া ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হয়। পরবর্তীতে এডিবির অর্থায়নে বাস্তবাবায়নাধীন ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি ইফিসিয়েন্সি ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (ইন্সটলেশন অব প্রি-পেইড গ্যাস মিটার ফর টিজিটিডিসিএল), বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘গ্যাস সেক্টর ইফিসিয়েন্সি ইম্প্রুভমেন্ট অ্যান্ড কার্বন এবাটমেন্ট প্রজেক্ট এবং পিজিসিএল অধিভুক্ত এলাকায় স্মার্ট প্রি-পেইড গ্যাস মিটার, স্ক্যাডা এবং জিআইএস স্থাপন অনুষ্ঠিত এই সভায় গৃহিত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে গ্যাসের অপচয়, সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত আবাসিক পর্যায়ে প্রি-পেইড গ্যাস মিটার সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে প্রতিবাদ জানায় একদল নাগরিক।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকের পর পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের দরপত্র স্থগিত করা হয়। একইভাবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বড় প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রমও থেমে যায়। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে। অথচ এসব প্রকল্পের প্রস্তুতি, নকশা প্রণয়ন ও প্রাথমিক কার্যক্রমে ইতোমধ্যে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে।
জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রি-পেইড গ্যাস মিটার চালু করা হয়। প্রথমে তিতাস গ্যাসের আওতায় ঢাকা অঞ্চলে এবং পরে কর্ণফুলী ও জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানির আওতায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে তিতাসের আওতায় প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার, কর্ণফুলী গ্যাসের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার এবং জালালাবাদ গ্যাসের আওতায় প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করছেন। অথচ দেশে মোট আবাসিক গ্যাস সংযোগ প্রায় ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার। অর্থাৎ অধিকাংশ গ্রাহক এখনো পোস্ট-পেইড ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর ২০১৯ সালের এক মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারের ফলে একটি পরিবারের মাসিক গ্যাস ব্যবহার গড়ে ৩৩ ঘনমিটার কমেছে। একই সঙ্গে গ্যাস বিলও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবহার অনুযায়ী বিল পরিশোধের সুযোগ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে সাশ্রয়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় পর্যায়েও গ্যাস সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে পোস্ট-পেইড ব্যবস্থায় আবাসিক গ্রাহকদের নির্ধারিত মাসিক বিল পরিশোধ করতে হয়, ব্যবহার কম বা বেশি হলেও বিলের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকে। অন্যদিকে প্রি-পেইড ব্যবস্থায় ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী বিল পরিশোধ করতে হওয়ায় গ্যাসের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমে আসে। একই সঙ্গে অবৈধ ব্যবহার, গ্যাস চুরি এবং বকেয়া বিল নিয়ন্ত্রণেও এ ব্যবস্থা কার্যকর বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জ¦ালানি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সঙ্গে পৃথক ঋণচুক্তির মাধ্যমে তিতাস গ্যাসের আওতায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১১ লাখ এবং এডিবির অর্থায়নে আরও ৬ লাখ ৫০ হাজার মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি কর্ণফুলী, বাখরাবাদ ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির আওতায়ও নতুন করে কয়েক লাখ মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু চলমান প্রকল্পগুলো স্থগিত হওয়ার ফলে শুধু বাস্তবায়নই নয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো সাধারণত অনুমোদিত প্রকল্প মাঝপথে পরিবর্তন বা স্থগিত করার বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করে। ফলে প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন এবং অর্থ ছাড়ের বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার শুধু বিল আদায়ের একটি পদ্ধতি নয়। এটি গ্যাস ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, সিস্টেম লস কমানো, অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ। এ কারণে চলমান প্রকল্পগুলো স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক, কারিগরি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রভাব নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে প্রকল্পগুলো কেন স্থগিত করা হলো, এটি সাময়িক নাকি স্থায়ী সিদ্ধান্ত, অথবা এর পরিবর্তে সরকারের বিকল্প পরিকল্পনা কী এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে গ্যাস খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে এই প্রকল্প স্থগিতের কারণ হিসেবে সঠিক ব্যখ্যা দিতে পারেনি জ¦ালানি বিভাগ। জনস্বার্থেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু রূপালি বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রকল্পটির আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি একটি অলাভজনক প্রকল্প। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে প্রকল্পটি গ্রহণের যৌক্তিকতা রয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডিপিপিতে নির্ধারিত তথ্য অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় গ্যাসের সিস্টেম লস ১০.৪ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ০.৬৪ শতাংশ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া প্রতি মাসে লিকেজজনিত ঘটনা ৩৩৩টি থেকে কমে ৬৬টি আনা সম্ভব হবে। তবে প্রকল্প এলাকায় আবাসিক পর্যায়ে যে সব পাইপলাইন রয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত পাইপলাইন প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। এতে গ্রাহক সুবিধা বেশি হবে। তবে সিদ্ধান্তটি স্থায়ী নয়’। গ্রাহক সুবিধা বিবেচনা করে এটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এমন একটি প্রকল্প বাতিল হওয়ায় ভবিষ্যতে জ¦ালানি খাতে বিশ^ব্যাংকের অর্থায়ন কতটা পাওয়া যাবে এ নিয়ে শংকা রয়েছে উল্লেখ করে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প স্থগিত হওয়ায় গ্যাস সাশ্রয়ের যে সম্ভাবনা ছিল তা কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। এ ছাড়া সিস্টেম লস, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে বড় কথা এমন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই সরকারকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার বিষয়টি ভাবতে হবে’।

