ঢাকা সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

দাবি আদায়  - মুখোমুখি প্রকৌশলীদের দুই পক্ষ 

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০৯:১২ এএম
প্রকৌশলী

দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের সংগঠন বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ। 

গতকাল শনিবার দুই পক্ষই নিজেদের দাবি আদায় ও আদায়ের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ সমাবেশ এবং নতুন কর্মসূচি পালন করেছে। বিএসসি প্রকৌশলীদের তিন দফা দাবি অযৌক্তিক দাবি করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পরিষদ। পাশাপাশি নিজেদের সাত দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটির নেতারা। অন্যদিকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীদের ‘ডিপ্লোমা সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে তিন দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা সংহতি প্রকাশ করেন। এ ছাড়াও গতকাল দিনভর বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে ধারাবাহিক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন তারা। 

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন নামের একটি সংগঠন। বিকেল ৫টায় বিক্ষোভ মিছিলটি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে শুরু করে ঢাবির কার্জন হল ঘুরে রাজধানীর শাহবাগের জাদুঘরে এসে শেষ করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটি (বুটেক্স) মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি), আহসানুল্লাহ ইউনিভার্সিটি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এইউএসটি) প্রকৌশলী শিক্ষার্থীরা।

মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বুটেক্সের শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তি বলেন, ‘ডিপ্লোমারা জবাই করে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। ফেসবুকে কমেন্ট বক্সে সরাসরি ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে।’

প্রিয়ন্তি এক পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ‘একজন পুলিশ কনস্টেবল বুয়েটের ২০২১-২২ বর্ষের একটি মেয়েকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। এ ধরনের হুমকি তারা কীভাবে দিতে পারে? আমরা এদের বিচার চাই।’

বুয়েটের ২০২০-২১ বর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ হুমকি দাতা পুলিশ কনস্টেবল রিফাতকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘প্রকাশ্যে ডিপ্লোমারা স্লোগান দিচ্ছে একটা একটা বুটেক্স ধর, ধরে ধরে জবাই কর। এ ধরনের ঘটনা ন্যক্কারজনক। এ ছাড়া একজন পুলিশ কনস্টেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের এক বোনকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো হামলা বা হুমকি দিলে আমরা বসে থাকব না।’

বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীর ওপর যদি হামলা বা হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে চুপ করে আমরা বসে থাকব না। আমরা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পাশে আছি, থাকব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জামিউল হাসান জামিল বলেন, ‘ডিপ্লোমাদের শিক্ষার অভাব রয়েছে। নাহলে তারা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে এভাবে হত্যা বা ধর্ষণের হুমকি দিতে পারে না। আমরা আমাদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব।’

প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছেÑ নবম গ্রেড সহকারী প্রকৌশলী পদে কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ ও ন্যূনতম যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার করা। দশম গ্রেডে যেন উচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরাও আবেদন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা। শুধু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং যাঁরা সম্পন্ন করবেন, তাঁরাই যেন প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) লিখতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।

অন্যদিকে বিএসসি প্রকৌশলীদের তিন দফা দাবি অযৌক্তিক দাবি করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ। পাশাপাশি নিজেদের সাত দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

গতকাল রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) সিইসি কনফারেন্স হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব ঘোষণা দেয় সংগ্রাম পরিষদ। ‘বিএসসি প্রকৌশলীদের অযৌক্তিক দাবি, নৈরাজ্যের প্রতিবাদ এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের যৌক্তিক সাত দফার পক্ষে’ এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। 

মতবিনিময় সভায় লিখিত বক্তব্যে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব মো. ইমাম হোসেন বলেন, দশম গ্রেড ওপেন (উন্মুক্ত) রাখলে বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের সঙ্গে পরীক্ষা দেবে। তাঁরা মেধাবী, এটা আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু তারা পাস করলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির কোনো সুযোগ থাকবে না। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করলে, তাঁরা বসে থাকবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন ইমাম হোসেন। 

তিনি আরও বলেন, সামনে একটা জাতীয় নির্বাচন আসছে; এই মুহূর্তে জাতীয় অনেক সমস্যা। আমরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাই না। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে গেলে আমরা কোনো ছাড় দেব না। এই তিন দফার পক্ষে, আমাদের বিপদের কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করলে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলব।

আইডিইবির সভাপতি কবির হোসেন বলেন, বিএসসি প্রকৌশলীদের তিন দফা দাবি আসলে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের অর্জিত অধিকার খর্ব করার প্রচেষ্টা। তিনি বলেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯৪ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা দশম গ্রেডে নিয়োগ পান এবং পদোন্নতির সুযোগ থাকে। কিন্তু বিএসসি প্রকৌশলীরা বলছে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের প্রকৌশলী বলা যাবে না এবং তাঁরা দশম গ্রেড থেকে নবম গ্রেডে পদোন্নতি পাবেন না। অথচ নিজেরা নবম গ্রেড থেকে এক নম্বর পর্যন্ত সব জায়গায় শতভাগ কোটা ভোগ করছেন।

সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আখেরুজ্জামান বলেন, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের একমাত্র চাকরির ক্ষেত্র হলো দশম গ্রেড। বিএসসি প্রকৌশলীরা যদি এই গ্রেডে ঢোকেন, তাহলে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাবে। এতে দেশের প্রায় ৫০০ পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানও ধ্বংসের মুখে পড়বে।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মোসলেম উদ্দিন, এরশাদ উল্যাহ, জয়নুল আবেদীন, আবদুস সাত্তার শাহ, জ্যেষ্ঠ সদস্যসচিব মিজানুর রহমান, সহজনসংযোগ ও প্রচার সম্পাদক সাহাবুদ্দিন প্রমুখ।

বিএসসি ও ডিপ্লোমাধারী প্রকৌশলীদের পাল্টাপাল্টি দাবি পর্যালোচনায় গত বৃহস্পতিবার ১৪ সদস্যের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে সরকার। এই ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রধান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম। ওয়ার্কিং গ্রুপ আন্দোলনকারী ও অভিভাবকদের সঙ্গে বসে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে, এরপর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে।