× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রহিম শেখ

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৬:৫৪ এএম

দেশের অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’ খালেদা জিয়া

রহিম শেখ

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৬:৫৪ এএম

দেশের অর্থনীতির ‘গেম  চেঞ্জার’ খালেদা জিয়া

  • অর্থনৈতিক উন্নয়নে ছিল অবিস্মরণীয় অবদান
  • উন্মুক্ত হয় অর্থনীতির বিকাশের পথ
  • মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত্তি ও ভ্যাট প্রবর্তন
  • পোশাক শিল্পের বিপ্লব ও নারীর কর্মসংস্থান শুরু হয়
  • ব্যাংক খাতে সংস্কার ও বেসরকারি ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটে

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এক চরম অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান হলেও তৎকালীন বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা ছিল খাদের কিনারায়। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তিনি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আনেননি, বরং সাহসিকতার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক দর্শনেও আমূল পরিবর্তন ঘটান। তার গৃহীত সংস্কার কর্মসূচিগুলোই মূলত একটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন অর্থনীতিকে আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে ধাবিত করেছিল। খালেদা জিয়ার শাসনামলে, বিশেষ করে ১৯৯১-৯৫ সময়ে বাংলাদেশে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু করা হয়, যা বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তার শাসনামলে ১৯৯৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণীত হয়, যা আজও দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকর রয়েছে। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প ধীরে ধীরে প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হয়। রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, আর্থিক খাতসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৩৯ দিনের মাথায় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যস্ত হয় দক্ষিণ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সীমিত ত্রাণ ও পুনর্বাসন সামগ্রী থাকা সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার সে সময় দুর্যোগ পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে। খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেওয়া হয় একাধিক কাঠামোগত সংস্কার।

খালেদা জিয়ার শাসনামলে অর্থনৈতিক সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছেন তখনকার অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তাকে সংস্কারের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সাইফুর রহমান অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার শুরু করেন। খালেদা সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৯১ সালে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যক্তি খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে, বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে। কোনো প্রকার বাধানিষেধ ছাড়াই শতভাগ বিদেশি মালিকানা ও যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হয়। দেশে যে ব্যক্তি খাতের সম্প্রসারণ ঘটেছে বা অর্থনীতি ব্যক্তি খাত নির্ভর হয়ে উঠেছে, সে ক্ষেত্রে এই নীতির বিশেষ ভূমিকা আছে। পরবর্তীকালে সব সরকার এই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

মূল্যস্ফীতির হার সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। পশুসম্পদ খাতে সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দেশব্যাপী গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার গড়ে ওঠে। একই সময়ে দেশে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রা আংশিক বিনিময়যোগ্য করা হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। উন্নয়ন বাজেটে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে নেওয়া পদক্ষেপের ফলে পাঁচ বছরে দেশীয় সম্পদের হিস্যা ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন। পাশাপাশি মুক্তবাজার ও বাণিজ্যিক উদারীকরণ নীতির অংশ হিসেবে আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে খাল-খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা হয়। চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার সিংহভাগই ছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষার জন্য।

মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত্তি ও ভ্যাট প্রবর্তন :

খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রথম বড় সোপান ছিল ১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রবর্তন। তৎকালীন সময়ে এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়। আজ বাংলাদেশের বাজেটের বড় একটি অংশ এই ভ্যাট থেকেই আসে। ভ্যাট প্রবর্তনের পাশাপাশি তিনি আমদানি শুল্কের হার কমিয়ে বিশ^বাজারের সঙ্গে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতার পথ তৈরি করে দেন। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।

পোশাক শিল্পের বিপ্লব ও নারীর কর্মসংস্থান :

খালেদা জিয়ার শাসনামলে তৈরি পোশাকশিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হয়। রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে পোশাক খাতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। বিশেষ করে শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে শুল্ক ও কর ছাড়ের পাশাপাশি বন্ড সুবিধা ও রপ্তানি প্রণোদনা দেন তিনি। প্রথম মেয়াদে তার সরকার পোশাক শিল্পের বিকাশে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি প্রথার যে সুযোগগুলো সম্প্রসারণ করেছিল, তা দেশের হাজার হাজার উদ্যোক্তাকে সাহসী করে তোলে।

ব্যাংক খাতে সংস্কার ও বেসরকারি ব্যাংকিংয়ের প্রসার :

১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর খালেদা জিয়ার সরকার ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দেওয়া হয়। এই সময় নতুন বেসরকারি ব্যাংক অনুমোদনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়ে, ফলে আর্থিক সেবার পরিধি বিস্তৃত হয়। ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা আনা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।

বিমা খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ :

খালেদা জিয়ার শাসনামলে বিমা খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ে। এর ফলে জীবন বিমা ও সাধারণ বিমা খাতে নতুন কোম্পানি গড়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমা খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে গ্রাহকসেবা উন্নত হয় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে।

শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ :

১৯৯১-৯৬ মেয়াদে শেয়ারবাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কার্যক্রম জোরদার করা হয় এবং বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ে। ২০০১-০৬ মেয়াদে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হয়।

রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান :

পোশাক শিল্পের বিকাশের ফলে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে রপ্তানি অর্থ দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ হয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়, যা অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেয়। তবে সুশাসন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল বলেও মত দেন তারা। সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার শাসনামল ব্যাংকিংব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বিমা ও শেয়ারবাজারে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং তৈরি পোশাকশিল্পকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন :

মানবসম্পদ উন্নয়নে খালেদা জিয়ার ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি এবং ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি চালুর সিদ্ধান্তটি ছিল বৈপ্লবিক। দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত হওয়ার ফলে ঝরে পড়ার হার কমে আসে এবং প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গবৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশ সারা বিশে^ উদাহরণ সৃষ্টি করে। এই দক্ষ ও শিক্ষিত জনবলই পরবর্তীকালে দেশের উৎপাদনশীলতা ও রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি :

২০০১-০৬ মেয়াদে তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে তিনি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দিকে বিশেষ নজর দেন। সেই সময়ে বিশ^বাজারে মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ থেকে ক্রমাগত বেড়ে প্রায় ৭ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমনÑ যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ করা হয়। একই সঙ্গে টেলিকম খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিয়ে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল যোগাযোগের প্রাথমিক ভিত্তিটি স্থাপন করেন। সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে দেশকে টেনে তুলে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের যে প্রাথমিক ভিত, তা নির্মিত হয়েছিল খালেদা জিয়ার শাসনামলেই।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!