উপকূলীয় জেলা বরগুনায় এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন চেনা রাজনৈতিক ছক ভেঙে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। হাট-বাজার, চায়ের দোকান কিংবা পাড়া-মহল্লার আড্ডায় এখন আর শুধু দলীয় আনুগত্যের আলোচনা নয়Ñ কে জিতবে, কেন জিতবে এবং শেষ পর্যন্ত ভাসমান ভোট কোনদিকে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরগুনার দুইটি সংসদীয় আসনেই ভোটের সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি মাঠে অনুপস্থিতি এবং সেই শূন্যতায় ইসলামী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান ও দৃশ্যমান অবস্থান।
বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে বরগুনা-১ আসন ছিল আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। তবে এবার দলটির অনুপস্থিতিতে আসনটি পুনর্দখলে মরিয়া বিএনপি। কিন্তু তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীক। দলটির আমির চরমোনাই পীর মুফতি রেজাউল করিম দাবি করেছেন, দেশের অন্য কোথাও জয় না পেলেও বরগুনার দুইটি আসনেই তার দল বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে তিনি নিজ ইউনিয়নসহ আশপাশের চারটি ইউনিয়নে পরিচিত মুখ। বরগুনা পৌর শহরেও তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও দলীয় সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। এ ছাড়া আমতলী ও তালতলী উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীরা সক্রিয় থাকায় এখানকার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকায় ভালো ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনা দেখছে দলটির একাধিক সূত্র।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। নিজ এলাকার সন্তান হওয়ায় স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ তার প্রতি ঝুঁকছে। পাশাপাশি আমতলী ও তালতলী উপজেলায় দলীয় কর্মী ও অনুসারীরা ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রতিদিনই নতুন ভোটার হাতপাখা প্রতীকের দিকে ঝুঁকছেন। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মাঠে কর্মীরা সক্রিয় থাকলে এসব এলাকায় ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরগুনা-১ আসনে এবার আঞ্চলিকতা, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটারদের আচরণÑ এই তিনটি বিষয়ই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
বরগুনা-২ ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলা নিয়ে গঠিত বরগুনা-২ আসনে রাজনৈতিক চিত্র আরও জটিল। অতীতে বিএনপি প্রার্থী নূরুল ইসলাম মনি টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তার জয়ে ইসলামী দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে ৫ আগস্টের পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে ইসলামী দলগুলো এখানে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। ফলে এবার ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মিজানুর রহমান কাসেমী এবং জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদÑ উভয়েই সক্রিয় প্রচার চালিয়ে বিএনপির ভোটব্যাংকে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছেন।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় যারা শুধু দল দেখে ভোট দিতেন, তাদের বড় একটি অংশ এবার প্রার্থী ও রাজনৈতিক বার্তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন।
বরগুনার দুই আসনেই ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। বিশেষ করে নারী, তরুণ এবং আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটারদের বড় অংশ প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ থাকলেও গোপনে ইসলামী দলগুলোর ‘সৎ নেতৃত্ব’ বার্তার প্রতি সহানুভূতিশীল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আওয়ামী লীগ সমর্থক বলেন, ‘পরিস্থিতির কারণে প্রকাশ্যে কিছু করতে পারছি না। মিছিলে যাই, কিন্তু ভোট দেব কিনা, সেটা ভোটের দিনই ঠিক করব।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরব ও ভাসমান ভোটই এবার বরগুনার নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক।
‘সৎ নেতৃত্ব’ বনাম ‘উন্নয়ন ও পরিবর্তন’
ইসলামী দলগুলোর প্রচারে মূল বার্তাÑ সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব। তারা নৈতিকতা, শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জনজবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে আনছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরগুনা-১ আসনের প্রার্থী মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ বলেন, ‘মানুষ এখন আর শুধু দল দেখে ভোট দেয় না, তারা সৎ প্রতিনিধি চায়।’ অন্যদিকে, বিএনপি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাসমান ভোট নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রায় সব প্রার্থীই এবার আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার আশ্বাস দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটার গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই চলছে সবচেয়ে কৌশলগত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
সব মিলিয়ে বরগুনার এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভোটার মনস্তত্ত্ব, নীরব সমর্থন ও সিদ্ধান্তহীন ভোটের এক কঠিন পরীক্ষা। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তৈরি শূন্যস্থান কে কতটা পূরণ করতে পারেÑ বিএনপি না ইসলামী দলগুলোÑ তার চূড়ান্ত উত্তর মিলবে ভোটের দিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন