ঢাকা রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান

অনিরাপদ খাদ্যে দিনে ১১৫ জনের মৃত্যু

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬, ০২:৩৪ এএম

উন্নয়নের গতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বেড়েছে অনিরাপদ খাদ্যগ্রহণের প্রবণতা। আর এরই জেরে দেশে প্রতিবছর অন্তত ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জন প্রাণ হারান অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে। শুধু তাই নয়, অসংক্রামক যেসব রোগে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯শ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তাও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

গতকাল শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনের আলরাজী কমপ্লেক্সে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) সম্মেলনকক্ষে বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস ও ফুড সেফটি মুভমেন্টের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ফুড সেফটি মুভমেন্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহমুদুল ইসলাম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম। এ সময় বক্তারা বলেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাস্তার খাবার বিক্রেতা ও ফুড কোর্টগুলোকে প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। এ জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন বাস্তবায়ন এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা এখন রাজধানীর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়, এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ফুড কোর্ট, রাস্তার খাবার বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ ও একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি। এতে যেমন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, তেমনি তাদের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এ সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিরাপদ খাদ্য নিয়ে নাগরিকদের সচেতন করতে ওয়ার্ডভিত্তিক এবং মসজিদভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণে আগ্রহী বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে ফুড সেফটি মুভমেন্টের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আশ্বাস দেন।

প্রশাসক আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা কেবল মুনাফার খাত হতে পারে না এগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, করোনা মহামারিতে যেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য দেশব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিয়েও জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে প্রতিবছর অনিরাপদ খাদ্যজনিত কারণে প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি অসংক্রামক রোগে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মানুষ মারা যায়, যার একটি বড় কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও ধর্মসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন উল্লেখ করে ড. মোস্তফা জানান, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ে তিনটি আইন ও ১৫টি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশজুড়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট, মনিটরিং, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত বছর প্রায় ১৬ হাজার মনিটরিং পরিচালনা করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা রেস্তোরাঁগুলোকে নিরাপদ খাদ্যের স্টিকার প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও ধর্মসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাদ্য ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ সময় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ ইসলাম শরীফ বলেন, দেশে খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ফাস্টফুডের প্রতি অতিনির্ভরতা এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে স্কুলের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাহমুদুল ইসলাম সেলিম বলেন, নিরাপদ খাদ্যের সঙ্গে নিরাপদ পানির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরিবেশনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, রাস্তার খাবার সংস্কৃতি এখন বাস্তবতা। তাই এসব বিক্রেতাকে উচ্ছেদ না করে প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে মসজিদের খুতবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান তিনি।