ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

এনসিটি-সিসিটি ইজারার ‘ষড়যন্ত্র’ বন্ধের দাবিতে মাঠে বন্দর রক্ষা কমিটি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার উদ্যোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে ‘বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম’ এবার কর্মসূচি দিয়েছে। শ্রমিক নেতা, রাজনীতিক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের নিয়ে গঠিত এ কমিটি রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংগঠনটি বুধবার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে মানববন্ধন ও সমাবেশের কর্মসূচি পালন করবে।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, অতীতেও আমরা এসএসএ (স্টিভেডরিং সার্ভিসেস অব আমেরিকা) পোর্ট নিয়ে অনেক খেলা দেখেছি। এসব খেলায় অনেক দেশি-বিদেশি চক্র জড়িত। সরকার বদলায়, কিন্তু এসব চক্র বদলায় না। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর আবার সেই চক্র নড়াচড়া শুরু করেছে। বন্দরের টার্মিনালগুলোতে নতুন করে আর বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। ব্যবস্থাপনারও কোনো সংকট নেই। সক্ষমতার চেয়েও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি)।

তিনি বলেন, ‘অথচ চুপিসারে চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতিপূর্বে হওয়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও টার্মিনাল কিংবা লালদিয়ার চর-সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ইতোমধ্যে গত বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ এক লাফে ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বেড়ে দেশের শিল্প, ব্যবসা, কৃষি ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশি-বিদেশি সম্ভাব্য ইজারাগ্রহীতাদের মুনাফার লোভকে বাড়িয়ে দিয়ে অতিরিক্ত লাভ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। যাতে ইজারাগ্রহীতারা বলতে পারে চার্জ তো আগে থেকেই বেশি।

এর আগে লিখিত বক্তব্যে প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল ইজারা দিলে তাদের আয়ের বড় অংশ লভ্যাংশ ও মুনাফার নামে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে বিদেশে চলে যাবে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্র হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার প্রশ্ন শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি এবং সিসিটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপরাটের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের তৎপরতা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি, বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণ ও বিতরণ কেন্দ্রসহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আমাদের এখন ভাবনার সময় এসেছে, জনগণের সম্পদ জনগণকে রক্ষা করতে হবে। বর্তমান গ্লোবাল পলিটিকসে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে। পরাশক্তি গুলোর সেই লড়াইয়ে চট্টগ্রাম বন্দর বিশেষ ভূমিকায় হাজির হতে পারে। কাজেই বন্দরের প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, ‘এনসিটির ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জড়িত। এর পাশেই নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও তেল শোধানাগারের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার আলোচনা চলছে, তারা কোন দেশি প্রযুক্তি এখানে ব্যবহার করবে? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্দোলনের মুখে চুক্তি স্থগিত করেছিল। কিন্তু যারা চুক্তির আলোচনায় জড়িত ছিল, সেই কর্মকর্তারা প্রায় সবাই বহাল তবিয়তে আছেন। এখন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তারা তৎপর।’

গত এক সপ্তাহ ধরে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দিতে ঢাকায় ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে জানিয়ে কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার চেষ্টা করছি। প্রধানমন্ত্রী মানবিক। দেশের স্বার্থে এনসিটি কাউকে দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। উনার সাথে দেখা করে পুরো বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরতে পারলে আশা করি তিনি দেশ ও জনগণের স্বার্থে নির্দেশনা দেবেন।’

সংবাদ সম্মেলনে এনসিটি ও সিসিটি দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারার সব উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করাসহ ৫ দফা দাবি জানানো হয়।

বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান এবং জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন।