ব্রিটিশ আমল থেকে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে চা-শিল্প। সময়ের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশে চায়ের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাড়ছে না কাক্সিক্ষত আয়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় নিলামে চায়ের বিক্রয়মূল্য কম থাকায় বর্তমানে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্প।
চা-বাগান মালিকদের দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কারণে চা উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে অনেক বাগান চা বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণ সংকটও অনেক বাগানের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৮৩৫ সালে চীনের বাইরে চা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে পরীক্ষামূলকভাবে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চা চাষ বিস্তৃত হয়।
বর্তমানে দেশে ১৬৮টি চা-বাগান রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় চা উৎপাদন হচ্ছে। আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় গত এক দশকে চা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। ফলে লাভের পরিবর্তে অনেক বাগানকে লোকসানের হিসাব করতে হচ্ছে।
চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, চা উৎপাদনের প্রধান ব্যয়ের একটি বড় অংশ শ্রমিক খাতে। ২০২২ সালে চা শ্রমিকদের আন্দোলনের পর দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে একজন শ্রমিককে দৈনিক নির্ধারিত মজুরি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চাপাতা উত্তোলনের জন্য বাড়তি অর্থও দিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। চাপাতা পরিবহন, কারখানার যন্ত্রপাতি পরিচালনা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, সার ও কীটনাশকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। চা-বাগান মালিকরা বলছেন, চা-শিল্প পুরোপুরি শ্রমিকনির্ভর। ফলে শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য খরচ বাড়লেও চায়ের বাজারমূল্য সে অনুযায়ী না বাড়ায় অনেক বাগান আর্থিক সংকটে পড়েছে।
বাগান মালিকদের অভিযোগ, উৎপাদন চালিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক বাগান আগের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় নতুন ঋণ পাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ চাহিদার তুলনায় কম ঋণ পাচ্ছে। তাদের দাবি, চা-শিল্পকে কৃষি খাতের আওতায় এনে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এ শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
অন্যদিকে চা শ্রমিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশের চা-শিল্পে অবদান রাখলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মজুরি বাড়ছে না। চা শ্রমিক পূর্ণিমা রেলি, জাদব রবিদাস ও অঞ্জু বলেন, কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বর্তমান মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর মজুরি বৃদ্ধির কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ ছাড়া বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ সময়মতো না পাওয়ার অভিযোগও করেন তারা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, বর্তমানে চা উৎপাদনের অবস্থা আগের তুলনায় ভালো। উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ১০ কোটি ২ লাখ কেজি, ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি এবং ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে।
২০২৬ সালে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছর আগাম বৃষ্টির কারণে চা উৎপাদন গত বছরের তুলনায় বাড়তে পারে বলে আশা করছে চা বোর্ড।
চা নিলামের গড় মূল্যও আগের তুলনায় বেড়েছে। চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি কেজি চায়ের গড় নিলাম মূল্য ছিল ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২ টাকা ৪৬ পয়সা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তবে বাগান মালিকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় এই মূল্য এখনো অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়।
চাতলাপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, চা উৎপাদন বাড়লেও অধিকাংশ বাগানের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক বাগান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। চায়ের গুণগত মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, ভালো মানের চা উৎপাদন না হলে নিলামে কাক্সিক্ষত দাম পাওয়া যায় না। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা) সুমন সিকদার বলেন, ২০২৬ সালে ১০৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৯৪ দশমিক ৯১ মিলিয়ন কেজি। চলতি বছর উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চা-শিল্প বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পানিসংকটসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চা-শিল্প প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। চা উৎপাদন, মান উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
চা-শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চায়ের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশের চা-শিল্প আবারও আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন