১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্য পুনরায় উদিত করার জন্য অসংখ্য আন্দোলন, অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায় ঘুরে ১৯৪৭-এর তথাকথিত দেশ ভাগের মাধ্যমে ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামো কর্তৃক নির্ধারিত বৃত্তে বাস করে তথাকথিত সে স্বাধীনতা যে প্রকৃতপক্ষে পরাধীনতার নতুন আরেক ডাইমেনশন তা বুঝতে বাংলাদেশিদের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি) খুব বেশি সময় লাগেনি।
আবার শুরু হয় সংগ্রাম। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন এবং জয় লাভ, ১৯৬২-এর শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা পরিক্রমায় ২৫ মার্চ কালোরাতে জাতি যখন নতুন দিশার সন্ধান করছে, জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সাড়ে ৭ কোটি মুক্তিকামী মানুষ যখন স্বাধীনতার নেশায় উন্মত্ত, বিপরীতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আবারও ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামোর নির্ধারিত বৃত্তের মধ্যে থেকেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যাকরণেই মুক্তির পথ খোঁজার নার্ভাস নীতিতে অটল। মুক্তিকামী জনতা চরমভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে ইতিহাসের প্রয়োজনে ইতিহাসেরই সন্তান, নাম তার জিয়াউর রহমান। যিনি আপাদমস্তক একজন সৈনিক। নিয়মানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলাই যার শেষ কথা। সেই তিনিই সেনাবাহিনীর সব ব্যকরণ এবং শৃঙ্খলাকে দেশপ্রেমের কাছে তুচ্ছ করে ক্ষমতা কাঠামোর বৃত্তীয় পরিধির আউটার লাইনে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহের দামামা বাজিয়ে সমস্বরে গর্জে উঠে ‘উই রিভোল্ট’।
মাত্র দুটি শব্দ অথচ এতটাই শক্তিশালী, মুহূর্তেই নিরক্ষর হাড় জিরজিরে এক-একজন মানুষের বুকের ছাতি কয়েক বর্গফুট প্রশস্ত হয়ে ওঠে। হয় একেকটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পরের দিন তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন স্বাধীনতার। সেনাবাহিনীর একজন মেজর হয়ে ওঠেন জনতার মেজর, আর সেই মেজরের কণ্ঠস্বর যেন হয়ে ওঠে জনতার কণ্ঠ। অদ্ভুতভাবে আলোড়িত হয় মুক্তিকামী মানুষ। শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেও তিনি সরাসরি ময়দানে উপস্থিত থেকে অসাধারণ সব কৌশল আর সাহসিকতায় অনন্য এক যোদ্ধা। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আসে চূড়ান্ত বিজয়। ভূষিত হন জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বোচ্চ খেতাব বীরউত্তম উপাধিতে। ফিরে যান নিজের কর্মস্থলে। মনোনিবেশ করেন সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে।
গণতন্ত্রের পথে উত্তরণেও তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। একজন সেনা অফিসার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সফলতা হচ্ছে একদলীয় বাকশাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করা; যা ইতিহাসে একেবারেই বিরল এক ঘটনা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বেশির ভাগ সেনা শাসক গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেখানে তিনি পুরোপুরি বিপরীত। কারণ তিনি ছিলেন প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ^াসী একজন মানুষ।
জিয়াউর রহমান তার সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে বাংলাদেশকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে যে সব পিলার দরকার হয় তার প্রতিটির শুধু ভিত রচনাই করেননি, তিনি সে-সব পিলারকে শক্ত মজবুত করে গড়ে তোলেন। তার ব্যক্তিগত গুণাবলি, দেশপ্রেম, দূরদৃষ্টি, কঠোর শৃঙ্খলাবোধ, আত্মসংযম, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, সাধারণ জীবনযাপন এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ^াস সর্বোপরি তার সততা তাকে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন দান করে।
এরপর নিজস্ব নেতৃত্বের গুণেই বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির একমাত্র স্লোগান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এরশাদ শাহির পতনের পরে তার নেতৃত্বেই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেন। আধুনিক বাংলাদেশের নারী মুক্তির নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই যেন তাকে নির্বাচিত করে রেখেছিলেন। তাই তো তিনিই বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী।
পরবর্তী সময়ে নানামুখী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরে জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে সংবিধান সংশোধন করে নিজেদের অবৈধ ক্ষমতায় থাকার পথ প্রশ^স্ত করতে থাকে। যার সমান্তরালে বিএনপি নেতাকর্মীসহ সব গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর চলে সীমাহীন দমন-পীড়ন, মামলা আর হামলা। তবে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার সব ষড়যস্ত্র উপেক্ষা করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে কোনো রকম আপস না করে বেগম খালেদা জিয়া কারাবরণ করেন। এরপর তার অসুস্থতা ও অন্যান্য বাস্তবতায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তারুণ্যের আইডল অসীম ধৈর্যের সাহসী নেতা তারেক রহমান।
৩১ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৫ আগস্টের আগে ও পরে তারেক রহমান অসামান্য রাজনৈতিক বিচক্ষণতার ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। তিনি তার নেতাকর্মীদের প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। দেশে উপস্থিত না থেকেও তিনি দলের এবং দেশের জনসাধারণকে উৎজীবিত করেন। তার ব্যক্তিত্ব, আচরণ, বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অবধারিতভাবেই তাকে আগামীর বাংলাদেশে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় নিয়ে আসে।
তবে এটাও সত্য যে বিএনপির মধ্য পর্যায়ের নেতৃত্ব বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি সৎ, শিক্ষিত এবং মার্জিত রুচিশীল নেতৃত্বের সংকট কাটিয়ে ওঠাটা একদম ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হলে ১৯৭১ ব্যর্থ হয়ে যাবে, ব্যর্থ হয়ে যাবে ১৯৯০ আর ২০২৪। সর্বোপরি ব্যর্থ হয়ে যাবে প্রিয় বাংলাদেশ। তাই বিএনপির কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত থাকুক যার ধারাবাহিকতায় বিএনপি তাদের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো কাটিয়ে উঠে আরও বেশি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে গিয়ে তারেক রহমান তথা বাংলাদেশের সমৃদ্ধি প্রশ^স্ত করুক এই প্রত্যাশা রাজনৈতিক সচেতন মহল করতেই পারে।

