ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

লড়াইটা ফিরে আসার

রুহুল আমিন ভূঁইয়া
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ১২:৪২ এএম

শিল্পের আঙিনায় যারা একসময় ছড়িয়েছেন আলো, আজ তাদের জীবনের আকাশটা মেঘে ঢাকা। নাট্যকার মাতিয়া বানু শুকু, অভিনেতা তারিকুজ্জামান তপন এবং নৃত্য পরিচালক জাকির হোসেনÑ এই তিন গুণী শিল্পী আজ মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন। অন্যদিকে, স্ট্রোক করে জীবনের সঙ্গে লড়ছেন নির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী।

পর্দার সেই হাসিমুখ, সেই ছন্দময় পা ফেলে চলাÑ আজ সব যেন এক বিষণœ কুয়াশায় ঢাকা। যারা আমাদের শিখিয়েছিলেন জীবনের জয়গান গাইতে, আজ তারাই লড়ছেন এক অসম যুদ্ধে, একা। গল্পের জাদুকর মাতিয়া বানু শুকু, যার কলমে প্রাণ পেত সহস্র অনুভুতি; আজ তার নিজের জীবনের ডায়েরিতেÑ ব্যথা আর সাহসের এক নিরন্তর লড়াইয়ের স্মৃতি।

গত ৮ মাস আগে মাতিয়া বানু শুকুর ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর তাকে চেন্নাই নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছুদিন ছিলেন। কেমো দেওয়া হয়েছে এবং থেরাপিও দেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে একটি করে কেমো দিতে হয়েছে। এ ছাড়া ২১ দিন পর পর থেরাপি দেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে মাতিয়া বানু নাটক এবং চলচ্চিত্রে সৃজনশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত জীবন ও সামাজিক বাস্তবতার গল্পগুলো তার নির্মাণে নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। তিনি ২০২১ সালের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ সিনেমার জন্য প্রযোজক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এ ছাড়া ‘গোল্লাছুট’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ এবং ‘প্রজ্ঞা পারমিতা’-এর মতো জনপ্রিয় টেলিফিল্ম, ধারাবাহিক নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন। আজ ভালো নেই মাতিয়া বানু শুকু। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন তিনি। কিন্তু ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সে জন্য সরকারের সহযোগিতা চাইছে পরিবার। সহকর্মী-বন্ধুরা করছেন ফিরে আসার দোয়া।

নৃত্যের ছন্দে যিনি মাতিয়ে রাখতেন রুপালি পর্দা, সেই জাকির হোসেন আজ স্তব্ধ, যন্ত্রণার শিকলে বন্দি; পায়ের নূপুর কথা বলে না, কোলন ক্যানসারের থাবায়Ñ এক বুক ব্যথা নিয়ে লড়ছেন তিনি জীবনের শেষ বাজি। নৃত্য পরিচালক জাকির হোসেনের শরীরে বাসা বেঁধেছে দুরারোগ্য ক্যানসার। হাসপাতাল-বাসা করে এখন কাটছে তার দিন। ভেঙে পড়া শরীরে ১৪ দিন অন্তর নিতে হচ্ছে কেমোথেরাপি। কিন্তু হচ্ছে না আশানুরূপ উন্নতি। ক্রমেই তার অবস্থা খারাপ হচ্ছে। গেল ফেব্রুয়ারির শেষে জাকিরের শরীরে ক্যানসারের অস্তিত্ব শনাক্ত করেন চিকিৎসক। প্রাথমিক পরীক্ষায় পেপটিক আলসার বলে সন্দেহ করেন চিকিৎসক। পরে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসেÑ জাকিরের শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যানসার।

জানা গেছে, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কেমোথেরাপি নিচ্ছেন জাকির। তাকে ১২টি কেমো নিতে বলা হয়েছে। ১৪ দিন পর পর একটি করে নিচ্ছেন। এরই মধ্যে ৫টি শেষ। কিন্তু শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি আশা করছেন না চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির এই সাবেক নেতা।

উন্নত চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাকির। অসুস্থতার কারণে অনেক দিন কাজহীন তিনি। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে এরই মধ্যে খরচ হয়েছে মোটা অংকের টাকা। তার ও পরিবারের খরচ মেটাচ্ছেন ভাই-বোনেরা। এমতাবস্থায় পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, সহকর্মী ও বন্ধুরা। পাশাপাশি সরকারি সহায়তার জন্যও আবেদন করেছেন তিনি।

জানা গেছে, জাকিরের চিকিৎসার জন্য তার সহকর্মী বন্ধুরা ফান্ড গঠন করেছে। এরই মধ্যে অনেকেই সাড়া দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি সহায়তা পেতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন জাকির।

অভিনেতা তারিকুজ্জামান তপন, যার চোখের মায়ায় জীবন্ত হতো চরিত্র; আজ সেই চোখজুড়ে কেবল বেঁচে থাকার আকুতিÑ নিঃশব্দে সয়ে চলেছেন যন্ত্রণার সব দহন। এই অভিনেতার খাদ্যনালির দহন সয়ে যার প্রতিটি প্রহর কাটে; চতুর্থ স্তরের অন্ধকার তাকে গ্রাস করতে চাইলেও, তিনি লড়ছেন ফিরে আসার তীব্র আকাক্সক্ষায়। ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন তারিকুজ্জামান তপন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি আছেন।

জানা গেছে, খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত তপনের শরীরে গত ডিসেম্বরে রোগটি ধরা পড়ে। পরে চিকিৎসকেরা জানান, ক্যানসারটি ইতোমধ্যে চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত তাকে তিনটি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে।

তপনের অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আলতা বানু’, ‘ঠিকানা’, ‘যা ছিল অন্ধকারে’। আর টেলিভিশন নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘জোড়া শালিক’, ‘হাতছানি’, ‘অল্পে গল্পে’ ও ‘মৃত্তিকার যাত্রা’।

শূন্য ক্যানভাসে মহাকাব্য আঁকা এক স্বপ্নদ্রষ্টা আজ জীবনের এক কঠিন বাঁকে থমকে দাঁড়িয়েছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী, যার হাতের ছোঁয়ায় ‘উত্তরের সুর’ বেজে উঠেছিল সেলুলয়েডের ফ্রেমে, আজ সেই হাত নিথর হয়ে আছে হাসপাতালের সাদা দেয়ালে। কাকলী, সেই নির্মাতা যে জীবনকে হারতে শেখায়নি কোনোদিন। তার প্রতিটি কাজ ছিল লড়াই আর ঐতিহ্যের সাক্ষী। সেই নির্মাতা স্ট্রোক করে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের বিছানায়। প্রতিদিন একাধিক থেরাপি দেওয়া হচ্ছে তাকে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা হওয়ায় ব্যয়ও বেড়েই চলেছে।

জানা গেছে, স্ট্রোক করার পর কাকলী প্যারালাইজড হয়ে গেছে। প্রায় চার মাস ধরে চিকিৎসা চলছে। নিয়মিত থেরাপি চলছে। কাকলী এখনো হাঁটতে পারছেন না। বাম হাত ও পা নড়াতে পারছেন না। হাতে তীব্র ব্যথা রয়েছে, সেটি রিকভারের চেষ্টা চলছে। নিজে থেকে উঠেও বসতে পারে না।

অভিনেতা প্রাণ রায় তার স্ত্রীর জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, কাকলীর মতো একজন জাতীয় সম্পদ ও মেধাবী নির্মাতার চিকিৎসায় সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সহায়তা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। সহকর্মী ও ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরন্তর তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন।

২০১২ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মিত ‘উত্তরের সুর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন শাহনেওয়াজ কাকলী। সিনেমাটি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন উৎসবে প্রশংসিত হয় এবং চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এর মধ্যে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার ছাড়াও শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসেবে এই সিনেমার জন্য জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন কাকলী।

নির্মাতা মাতিয়া বানু শুকু, শাহনেওয়াজ কাকলী, অভিনেতা তারিকুজ্জামান তপন, নৃত্য পরিচালক জাকির হোসেনরা ফিরতে চান আলোর মিছিলে, সৃজনের উৎসবে; তারা ফিরতে চান ভালোবাসার চেনা সেই হাত ধরে। মানুষের প্রার্থনা আর আমাদের ক্ষুদ্র সহযোগÑ হয়তো মুছে দেবে তাদের দুঃখের মেঘ, ফিরে আসবে ভোর ঘরে ঘরে। সুস্থ হয়ে উঠুন আমাদের এই শিল্পীরা, আপনাদের কলম, কণ্ঠ আর অ্যাকশন শব্দ আবার ফিরে পাক সেই পুরোনো ছন্দ।