পর্দা নেমেছে আজ নাট্যশালার, স্তব্ধ একাকী সেই গ্রিনরুম, যেখানে শব্দেরা জেগে উঠত ছুঁয়ে জীবনের অনন্ত ঘুম। তুড়ি মেরে যিনি জাগিয়ে তুলতেন ইতিহাসের মৃত সব চরিত্র, আজ তিনি নিজেই মহাকালের মঞ্চে। মঞ্চের মহাজীবন ও শব্দের কারিগর, বরেণ্য নাট্যজন আতাউর রহমান পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। গত সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
গতকাল বিকেলে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। তার আগে বরেণ্য এই অভিনেতার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তাকে দাফন করা হয়।
১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর মারা গেছেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব। আগামী জুনে তার ৮৫ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। আতাউর রহমান স্ত্রী শাহিদা রহমান, এক মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান, এক ছেলে শ্বাশত রহমানসহ ভক্ত, শুভাকাক্সক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বাংলা নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বল এই নক্ষত্রের মৃত্যুতে দেশের শোবিজ অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানা যায়, গত ৮ মে, বাসায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন আতাউর রহমান। এরপর দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় চিকিৎসা সহায়তায় রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধ থামিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব।
স্কুল জীবনেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পা রাখেন আতাউর রহমান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নটীর পূজা’ নাটক দেখে তার মঞ্চপাঠ শুরু। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শহীদুল্লাহ হল থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ আতাউর রহমান প্রথম মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন আতাউর রহমান। ১৯৭২ সালে ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’-এর মাধ্যমে তার নাট্য নির্দেশনা শুরু। এরপর তিনি নির্দেশনা দেন বাদল সরকারের লেখা ‘বাকি ইতিহাস’। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শন শুরু হয়। এরপর নিজের দলে ও অন্য দলের হয়ে অসংখ্য নাটকে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। মঞ্চ নাটকের নির্দেশনার পাশাপাশি আতাউর রহমান অভিনয়ও করেছেন সমানতালে। রেডিও, টেলিভিশনেও ছিল তার উপস্থিতি। এ ছাড়া নাট্যবিষয়ক বই, নাট্যসমালোচনা, উপস্থাপনা, শিক্ষকতা, টেলিভিশন নাট্যকার, প্রবন্ধকার, বক্তা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে আতাউর রহমানের ছিল সরব পদচারণা। অভিনয় করেছেন বেশ কিছু টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে।
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকটি মাধ্যমে কাজ করেছেন এই নাট্য ব্যক্তিত্ব। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি মঞ্চনির্দেশনা করেছেন। লেখক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত। দেশের সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আতাউর রহমান পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার।

