ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

নেই প্রচারণা

এখনো চূড়ান্ত হয়নি ঈদের সিনেমা

রুহুল আমিন ভূঁইয়া
প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০৬:২৮ এএম

আর একদিন পরই ঈদুল আজহা। তবে সিনেমাপাড়ায় আজ নীরবতা। নতুন সিনেমা নিয়ে নেই কোনো কোলাহল ও প্রচারণা। পোস্টারের রঙে রঙিন হয়নি শহরের চেনা দেয়াল, ঝিমিয়ে পড়েছে প্রচারের সুর। ঈদ ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি ঠিক কতটি সিনেমা মুক্তি পাবে এবং মাঠে কোনো জোরালো প্রচারণাও চোখে পড়ছে না। বেশ কয়েক বছর ধরে সিনেমা মুক্তির আগে প্রচারণা নিয়ে প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পীদের মধ্যে উদাসীনতা চোখে পড়ার মতো। ঢাকাই চলচ্চিত্র শিল্পের অপেশাদারিত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আসন্ন ঈদের সিনেমা মুক্তি ও প্রচারণার এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। প্রতি বছর ঈদ উৎসবকে বাংলাদেশের সিনেমার একমাত্র ‘লাইফলাইন’ ভাবা হলেও, উৎসবের মাত্র একদিন বাকি থাকতেও ঠিক কতটি সিনেমা মুক্তি পাবে তা চূড়ান্ত না হওয়া এবং মাঠে কোনো জোরালো প্রচারণা না থাকা চরম এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা। একাধিক প্রযোজক ও নির্মাতা আছেন দোলাচলে। সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, কী করবেন। মুক্তি দেবেন নাকি সরে আসবেন! চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অপেক্ষা করতে চান চাঁদ রাত পর্যন্ত।

গত রোজার ঈদে ১৬টি সিনেমা মুক্তির কথা ঘোষণা এলেও শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে মাত্র ৫টি সিনেমা। এবারও মুক্তির তালিকায় আছে ১০টি সিনেমা। রয়েছে নবীন পরিচালক আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’, মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’, মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’, সাইফ চন্দনের ‘মালিক’, সৈকত নাসিরের ‘মাসুদ রানা’, আকাশ হকের ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’, বদিউল আলম খোকনের ‘তছনছ’ ও ‘অফিসার’, জাহিদ জুয়েলের ‘পিনিক’ এবং আলোক হাসানের ‘নাকফুলের কাব্য’। সব নির্মাতাই চাচ্ছেন ঈদে সিনেমা মুক্তি দিতে। শেষ পর্যন্ত কয়টি সিনেমা আলোর মুখ দেখবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। তবে ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’র নির্মাতা ঘোষণা দিয়েছেন, শেষ?পর্যন্ত হল না পেলে বিকল্প উপায়ে হলেও সিনেমা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবেন তারা। ঈদের একদিন আগেও সিনেমা মুক্তির সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভুগছেন প্রযোজক ও পরিচালকরা। কারণ, দেশে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত হল পাওয়া নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। মুক্তির দৌড়ে ১০টি সিনেমা থাকলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে পাঁচটি সিনেমা। সেই তালিকায় এগিয়ে ‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, পিনিক’ ও ‘মাসুদ রানা’। বাকি সিনেমাগুলোর নির্মাতারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হল পাওয়ার জন্য।

এবার ঈদের সিনেমার নতুন আলোচনার বিষয় আইনি জটিলতা। সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘বনলতা সেন’ নিয়ে নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের সঙ্গে নানা বিষয়ে সহ-প্রযোজক তরুণ মজুমদারের মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছেন তরুণ। এই জটিলতা এখনো কাটেনি। তার মধ্যেই সিনেমাটি এসেছে মুক্তির ঘোষণা। তবে নেই প্রচারণা। সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পাবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।

এদিকে, ‘মালিক’ সিনেমার ট্রেলার মুক্তির পর নির্মাতা সাইফ চন্দনের বিরুদ্ধে পারিশ্রমিক না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন চিত্রনাট্যকার সিদ্দিক আহমেদ। অনুমতি না নিয়ে চিত্রনাট্য পরিবর্তনের অভিযোগও এনেছেন তিনি। এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কথাও জানান এই চিত্রনাট্যকার। তবে পরিচালক চন্দন বলছেন ভিন্ন কথা। চিত্রনাট্যকারের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

এবারের ঈদে মুক্তির মিছিলে চিত্রনায়িকা পূজা চেরি অভিনীত ‘নাকফুলের কাব্য’ ও ‘মাসুদ রানা’ নামের দুটি সিনেমা রয়েছে। তবে সিনেমা দুটি নিয়ে প্রচারণায় নীরব এই নায়িকা। শোনা যাচ্ছে, পূজার বাবা প্রতারণা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে যাওয়ার খবর সামনে আসতেই সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন তিনি। অন্যদিকে, শবনম বুবলী অভিনীত ‘পিনিক’ সিনেমাটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু সিনেমার প্রচারণায় নেই তিনিও। গত ঈদের আগেই সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। বর্তমানে বুবলী অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্য সিনেমার প্রধান অভিনয়শিল্পেীদের পক্ষ থেকেও প্রচারণামূলক কোনো বিশেষ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি এখনো ‘ঈদ-নির্ভরতা’ থেকে বের হতে পারেনি। সারা বছর সিনেমা হলগুলো দর্শক খরায় ভুগলেও, ঈদের সময় এক ডজন সিনেমা মুক্তির প্রতিযোগিতায় নামে প্রযোজক-পরিচালকেরা। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে পর্যাপ্ত হল না পেয়ে শেষ মুহূর্তে অনেক সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়ে। এবারের অনিশ্চয়তা মূলত বিগত বছরের লোকসানের ভয় এবং হল বরাদ্দের সঠিক নীতিমালার অভাবেরই ফল।

নির্মাতারা মুক্তি নিয়ে দ্বিধায় থাকায় প্রচার স্বল্পতায় ভুগছে সিনেমাগুলো। আজকের ডিজিটাল যুগে যেখানে বিশ্বজুড়ে সিনেমা মুক্তির মাসখানেক আগে থেকে টিজার, ট্রেলার ও গান দিয়ে দর্শককে বুঁদ করে রাখা হয়, সেখানে আমাদের দেশে ঈদের বাকি একদিন অথচ দর্শকের বড় অংশই জানে না প্রেক্ষাগৃহে কী আসছে! ফেসবুক বা ইউটিউবে দায়সারা দু-একটি পোস্টার ছাড়া কোনো পরিকল্পিত বিপণন কৌশল চোখে পড়ছে না। কনটেন্ট তৈরির চেয়ে শেষ মুহূর্তে কীভাবে বেশি হল দখল করা যাবে, তা নিয়েই ব্যস্ত সিনেমা সংশ্লিষ্টরা। সিনেমা মুক্তির সংখ্যা চূড়ান্ত না হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে বুকিং এজেন্ট ও হল মালিকদের সঙ্গে লগ্নিকারকদের স্নায়ুযুদ্ধ। অল্প কিছু ডিজিটাল স্ক্রিন ও সীমিত সিঙ্গেল স্ক্রিনের ওপর ভিত্তি করে সবাই বাজি ধরতে চান। পেশাদার কোনো ডিস্ট্রিবিউশন চেইন না থাকায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলে দরদাম আর হলের নোংরা রাজনীতি, যার বলি হয় ভালো কনটেন্ট। উৎসবের আমেজে দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে বিনোদিত হতে চান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে সেন্সর ছাড়পত্র নিয়ে কোনো প্রচার ছাড়াই প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা মুক্তি দিলে দর্শক কোন সিনেমাটা দেখবে তা বাছাই করার সুযোগ পায় না। এটি দর্শকের পকেটের টাকা এবং আগ্রহের সাথে এক ধরণের তামাশা। গেল রোজার ঈদে হতাশ করেন চিত্রতারকা শাকিব খান। যদিও এই নায়ক তাদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেন। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে সিনেপ্লেক্স সব জায়গাতেই ভরাডুবি হয় তার অভিনীত ‘প্রিন্স’ সিনেমাটি। ব্যর্থতা ঝেড়ে এই ঈদে ‘রকস্টার’ দিয়ে সাফল্যে ফিরতে মরিয়া শাকিব খান। তবে প্রচারণায় নীরব এই নায়কের সিনেমাও। তবুও ঈদের আনন্দ বাড়াতে বড় পর্দায় ঝড় তুলতে চান শাকিব খান!

অন্যদিকে, দীর্ঘ সাত বছর পর পর্দায় ফিরছে আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম জুটি। তাদের ঘিরেও দর্শকদের এক ধরনের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। ‘হাওয়া’ মুক্তির তিন বছর পর নতুন সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’। এই সিনেমার গান ও ট্রেলারে লোকেশনে নতুনত্বের আভাস পাওয়া গেছে। 

ঈদের সিনেমাগুলোতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন শাকিব খান, আরিফিন শুভ, বিদ্যা সিনহা মিম, আদর আজাদ, সাবিলা নূর, পূজা চেরি, শবনম ইয়াসমিন বুবলী, মাসুমা রহমান নাবিলা, খায়রুল বাসার, নাজিফা তুষি, রাসেল রানা, সৈয়দা তিথি অমনি, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, দেবদ্যুতি আইচ, রকি খান, মুন্না খান, ইয়ামিন হক ববি, ডি এ তায়েব প্রমুখ।

চলচ্চিত্রকে ‘শিল্প’ দাবি করা হলেও এর বাজার এখনো চলছে পুরোনো মান্ধাতা আমলের নিয়মে। ঈদের এই শেষ মুহূর্তের অচলাবস্থা প্রমাণ করে যে, কনটেন্টের মানোন্নয়নের চেয়ে সস্তা হুজুগে ব্যবসা করার মানসিকতাই এখনো এখানে প্রবল।