এফডিসির ঝলমলে আলো আর ক্যামেরার পেছনের গল্পটা যে এতটা অন্ধকার হতে পারে, তা হয়তো খোদ চলচ্চিত্রের মানুষদেরও ভাবনার অতীত ছিল। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে নতুন এক তুমুল বিতর্ক। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় নায়িকা রোজিনা। সদ্যসমাপ্ত ২০২৬-২৮ মেয়াদের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এবং নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরীর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা’র গুরুতর দাবি এনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন তিনি। ক্ষোভ ও অভিমানে এই কিংবদন্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেনÑ মৃত্যুর পর তার লাশ যেন আর কোনোদিন এফডিসির প্রাঙ্গণে না নেওয়া হয়।
গত ৩ জুলাই টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন। এই নির্বাচনে সহসভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন রোজিনা। নির্বাচনের ফলে শিবা সানু সভাপতি এবং জয় চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জয়ী হন। অন্যদিকে, সহসভাপতি পদে রোজিনা ১৫২ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। তবে এই ফলকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তার দাবি, এই হারের পেছনে রয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্র এবং সরাসরি জয় চৌধুরীর দেওয়া বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণা।
গত রোববার রাতে উত্তরার নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রোজিনা তার ভেতরের সব ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি অভিযোগ করেন, জয় চৌধুরী তার সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা করেছেন। নির্বাচনের আগে জয় চৌধুরী তাকে প্যানেলে নেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেন এবং নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে জয় চৌধুরী ও তার চক্র রোজিনাকে হারানোর জন্য সূক্ষ্ম কারচুপি ও ভোট জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
রোজিনার ভাষ্য মতে, ভোটারদের ভুল বুঝিয়ে তার ব্যালট নষ্ট করা হয়েছে এবং তাকে নিশ্চিত বিজয়ের পথ থেকে ছিটকে দেওয়া হয়েছে। জুনিয়র একজন সহকর্মীর কাছ থেকে এমন চরম অবমাননা ও প্রতারণা তিনি কোনোভাবেই আশা করেননি।
এই অভিনেত্রী বলেন, বেশ কয়েকবার অনেকের অনুরোধে শিল্পী সমিতির নির্বাচনে জয়ী হয়ে দায়িত্ব পালন করেছি। কখনো নির্বাচনে হারিনি। জায়েদ খানের অনুরোধে নির্বাচন করেছিলাম। জায়েদ খানকে সিনিয়র শিল্পীদের কাছে আমি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সর্বশেষ জায়েদ খান ও নিপুণের পদ নিয়ে মামলা, কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেই। তারপরও আবার অনুরোধে নির্বাচন করতে হয়েছিল। সর্বশেষ আমার জন্মদিনে এসে অনেক আকুতি করে আমাকে নির্বাচন করতে রাজি করিয়েছিল জয়। সে সময় বলেছিল আমার কিছু করতে হবে না। পাস করানোর দায়িত্ব নেয়। জয়কে অনেকবার বলেছি যে, আমার যাতে সম্মানহানি না হয়। জয় আমাকে আশ্বস্ত করেছিল যে আমার সম্মানহানি হবে না। কিন্তু সেটাই হলো।
নির্বাচনে রোজিনাকে ট্রাম্প কার্ড বানানো হয়েছে উল্লেখ করে অভিনেত্রী বলেন, আমাকে পাস করাবে না তা আগের দিনই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাকা দিয়ে ভোট কিনেছে জয়। জয়ের ভোটার এবং প্যানেলের ভোট আমাকে দেয়নি। আমাকে হারানো হয়েছে। জয় চৌধুরীর উচিত হয়নি আমার সম্মানহানি করা। আমি ভাবতে পারিনি যে, পরিকল্পনা করে আমাকে হারিয়ে দিবে। এতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। ট্রাম্প কার্ড বানিয়ে নিজের ফায়দা না নিয়ে সিনিয়র শিল্পীদের সম্মান করা উচিত ছিল। আমার পরিবার এ ঘটনায় খুবই মর্মাহত। আমি যেতে চাই না, তারপরও হাত ধরে অনুরোধ করে নেয়। আমি হারিনি কিন্তু আমাকে হারানো হয়েছে। আগে থেকেই ওরা পরিকল্পনা করে রেখেছিল। অধিকাংশ শিল্পী টাকার বিনিময় ভোট দেয়।
পরাজিত প্রার্থী পলির হারে কষ্ট পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, পলি মাঠ পর্যায়ে অনেক পরিশ্রম করেছিল। ওর হারে আমি কষ্ট পেয়েছি। জয় চৌধুরী আমাকে ফোন করেছিল, ধরিনি। পলিকে ফোন করার পর জানতে চেয়েছিল আপুকে কেন হারালে। উত্তরে জয় বলেছে, তাকে হারানোই উচিত ছিল। তিনি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেননি। প্রচারে ছিলেন না। কিন্তু আমার দায়িত্ব নিয়েছিল জয়। আরও বলেছে আমি বিশ্রাম করি। আমি কি শিল্পী সমিতিতে চাকরি করতাম? সে এভাবে বলতে পারে? এরা সিনিয়রদের সামনে সামনে সম্মান দেখায় অন্তরে অসম্মান করে। এফডিসিতে গেলেও আর শিল্পী সমিতিতে যাব না। আমাকে চক্রান্ত করে হারিয়েছে। এভাবে আমার সম্মানহানি করা ঠিক হয়নি। নির্বাচনে টাকার খেলা আর ষড়যন্ত্র হয়েছে। মুক্তি এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পারেনি। সবকিছু পরিকল্পনা করেই বেইমানি করেছে।
কিংবদন্তি অভিনেত্রী আনোয়ারা বেগম মেয়ে মুক্তির জন্য অসুস্থতা নিয়েই ভোটের মাঠে সরব ছিলেন। তার মেয়ে সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ে হেরে গেছে। আমিও চেয়েছিলাম মুক্তি পাস করুক। আনু আপা কিংবদন্তির উপরে কিছু থাকলে সেটা তিনি। সবমিলিয়ে এবার খুব খারাপ হয়েছে। একতরফা চক্রান্ত হয়েছে, বললেন রোজিনা।
এ সময় শিরিন শিলার সমালোচনা করেছেন রোজিনা। সেই সঙ্গে বলেছেন, নিপুণের সময় থেকে টাকা লেনদেন শুরু হয়েছে। অধিকাংশ শিল্পীই টাকা ছাড়া ভোট দেয় না। আমি কেন টাকা দিয়ে নির্বাচন করব? এই টাকার খেলায় আমি যেতে চাইনি। এখন যারা ভোটার তাদের অনেককেই চিনি না। আমি শিওর আমাকে ভোট দিতে না করেছে সবাইকে। কিন্তু আমাকে যারা ভালোবাসে এবং প্রকৃত অর্থে শিল্পী তারাই আমাকে ভোট দিয়েছেন। না হলে এত ভোট পেতাম না। আমাদের দেখিয়ে ফায়দা নিয়েছে আবার পেছনে ভোট দিতে না করেছে। ওদের যাদের দরকার তাদের পাস করিয়েছে। শিল্পী সমিতিতে প্রাইভেসি নেই। অনেকেই বেফাঁস কথা বলে। আর কখনোই শিল্পী সমিতিতে যাব না। বিগত সময় সম্মান পেলেও এবার আমাকে অসম্মানিত করা হয়েছে।
জয় চৌধুরী আমাদের ট্রামকার্ড বানিয়ে অসম্মান করেছে। তাদের হাতে শিল্পী সমিতি বা শিল্পীরা কতটা নিরাপদ, চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের কাছে এই প্রশ্ন রেখেছেন রোজিনা। সংবাদ সম্মেলনে শুধু জয় চৌধুরীই নন, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার দিকেই আঙুল তুলেছেন এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না। ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপে আমি নানা অসংগতি আর জালিয়াতি লক্ষ করেছি। এফডিসির বর্তমান পরিস্থিতি এখন আর আগের মতো নেই। এখানে এখন আর কোনো সম্মান কিংবা সিনিয়রদের প্রতি মূল্যবোধ অবশিষ্ট নেই।
রোজিনা আরও যোগ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে এই চলচ্চিত্রাঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরেও আজকে তাকে যেভাবে অবমূল্যায়িত হতে হলো, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। চলচ্চিত্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও চরম অভিমান থেকে রোজিনা এক নজিরবিহীন ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যে এফডিসিকে নিজের ঘর মনে করতাম, সেখানে এখন কেবলই নোংরা রাজনীতি। আমি আজ বলে যাচ্ছি, মৃত্যুর পর আমার লাশ যেন ভুলেও এফডিসিতে নেওয়া না হয়! আমি এই নোংরা পরিবেশের ছোঁয়া আর আমার মরদেহেও লাগাতে চাই না।
রোজিনার এই বিস্ফোরক সংবাদ সম্মেলনের পর চলচ্চিত্রপাড়ায় রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। অন্তর্জালে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে অনেক সিনিয়র-জুনিয়র শিল্পী রোজিনার এই সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনেকেই মনে করছেন, শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেভাবে একের পর এক নোংরামি প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের কাছে চলচ্চিত্রের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ ক্ষুণœ হচ্ছে।
যদিও রোজিনার এই অভিযোগের বিপরীতে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরী বা শিল্পী সমিতির বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা পাল্টা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রোজিনার এই কান্না আর এফডিসির প্রতি তীব্র বয়কট সিনেমা হলের রুপালি পর্দার চেয়েও এক বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসে।

