ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্বপ্ন ভঙ্গ হাওরের কৃষকের

মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৭:১০ এএম

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় এবারও ফিরে এসেছে বর্ষার চিরচেনা আতঙ্ক। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে হাওর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ নি¤œভূমি প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে হাজারো কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধান মাঠে যেমন তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়, তেমনি ঘরে কাটা ধানেও অঙ্কুর (গেঁড়া) ধরছে। গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন হাওরের পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষের দিকে হলেও অনেক কৃষক এখনো মাঠ থেকে ফসল তুলতে পারেননি। হঠাৎ পানির তোড়ে পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে, আর যেগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।

চলমান এই দুর্যোগে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কাটা ধান শুকাতে না পারার সংকট। কৃষকরা অল্প কিছু ধান ঘরে তুলতে পারলেও টানা বৃষ্টি ও সূর্যের দেখা না মেলায় তা শুকাতে পারছেন না। ফলে ভেজা ধান স্তূপ করে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এতে ধানে অঙ্কুর ‘গেঁড়া’ ধরে যাচ্ছে, যা ধানের গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে।

স্থানীয় কৃষক জয়নাল মিয়া, মঞ্জু সরকার, সঞ্জয় সরকার ও সবুজ মিয়াসহ অনেকেই জানান, ধান কেটে ঘরে তুলেছি, কিন্তু শুকাতে পারছি না। দুই-তিন দিন ভেজা থাকলেই ধানে গেঁড়া ধরে যায়। তখন ভালো দাম তো দূরের কথা, অনেক সময় বিক্রিই করা যায় না।

হাওর পাড়ের রংচী গ্রামের কৃষক আইনুদ্দিন মিয়া বলেন, কষ্ট করে ধান কেটে ঘরে তুলেছি, কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে শুকাতে পারছি না। দুই-তিন দিন ভেজা থাকলেই ধানে গেঁড়া ধরে, অনেক জায়গায় অঙ্কুরও বের হচ্ছে। এতে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় না। আমাদের সারা বছরের পরিশ্রম যেন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

গত ২৮ এপ্রিল সকালে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের চাপে হামিদপুর গ্রামের পাশে জামগড়া খাল-সংলগ্ন ইয়ারন (ইকারছই) বিলের সড়ক ভেঙে যায়। এতে হাওরের নি¤œাঞ্চলে দ্রুত পানি ঢুকে পড়ে এবং মাঠের ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ওই বিলসংলগ্ন ১২টি গ্রামের ১১৪ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হলেও অবশিষ্ট প্রায় ৬৮ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। একই দিন বিকেলে চামরদানী ইউনিয়নের ঝিনারিয়া হাওরের বাঁধ ভেঙে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সেখানে ১৩০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ১৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আনুমানিক ১০৫ টন ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় উপজেলা কৃষি অফিস।

হামিদপুর গ্রামের কৃষক শরিফুল মিয়া জানান, ১০ কিয়ার জমিতে ধান করেছি, কিন্তু এখনো একটি ধানও কাটতে পারিনি। একই গ্রামের আরেক কৃষক বলেন, ৭ কিয়ার জমিতে ধান করেছি, কিন্তু কিছুই তুলতে পারিনি। এখন কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।

হাওর পাড়ের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক নজির হোসেন বলেন, হাওরে পানি থাকায় হারভেস্টার নামানো যাচ্ছে না, আবার শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টির কারণে ধান কাটাও বন্ধ। অনেকেই আধাপাকা ধান কাটছে, তাতেও লোকসান হচ্ছে। সারা বছরের একমাত্র ফসল এই বোরো ধান। এটা হারালে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

সব মিলিয়ে মধ্যনগরের কৃষকরা এখন চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে মাঠের ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে কাটা ধানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রকৃতির সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে তাদের সারা বছরের পরিশ্রম যেন ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার স্রোতে।

উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুর রহমান জিয়া জানান, দুর্বল বাঁধ-ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। কার্যকর বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের উন্নত ব্যবস্থা এবং আগাম সতর্কতা জোরদার না করলে এই সংকট আরও তীব্র হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আশয়াদ বিন খলিল রাহাত বলেন, টানা বৃষ্টি ও হাওরে পানি বৃদ্ধির কারণে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কাটা ধান শুকাতে না পারায় গেঁড়া ধরছে এবং অঙ্কুর বের হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার এবং সামান্য রোদ পেলেই শুকানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে তালিকা তৈরির কাজ চলছে।