ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বন্দরে ভ্রমণ খাতে ধস

জনশূন্য প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল

মো. জামাল হোসেন, বেনাপোল
প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

ভারত ভ্রমণ ভিসায় আরোপিত বিধিনিষেধ এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত। ফলে একসময় যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকা দেশের বৃহত্তম বেনাপোল স্থলবন্দরের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ভোর হতেই যেখানে শুরু হতো হাজারো মানুষের কোলাহল, ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ সারি আর ট্রাভেল এজেন্টদের হাঁকডাক, সেখানে এখন ভর করেছে এক সুনসান নীরবতা। ভিসা জটিলতা দীর্ঘায়িত হওয়ায় যাত্রী সংকটের পাশাপাশি সীমান্ত অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও দূরপাল্লার পরিবহনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ স্থবিরতা ও ধস নেমে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত সরকার ভ্রমণ ভিসায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে সীমিত পরিসরে মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসা চালু করা হলেও পর্যটন, ব্যবসা ও অন্যান্য সাধারণ ভিসা এখনো স্বাভাবিক করা হয়নি। এর ফলে চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পর্যটনের উদ্দেশে ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছে সীমান্ত অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি।

যাত্রী সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা খাতে। বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ বিভিন্ন রুটের দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাসগুলো এখন পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছে না। ফলে চালক, হেল্পার ও বুকিং কাউন্টারের স্টাফরা চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। স্টেশন ও টার্মিনাল-সংলগ্ন ফুটপাতের ক্ষুদ্র দোকানদার এবং রেস্তোরাঁ মালিকদের দৈনিক বেচাকেনাও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। লোকসান গুনতে গুনতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

ইমিগ্রেশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে (১১-২০ মে) বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে মাত্র ১৬ হাজার ২২২ জন পাসপোর্টযাত্রী যাতায়াত করেছেন। অথচ আগে যেখানে প্রতিদিন এই পথে ৯ থেকে ১০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতেন, সেখানে এখন সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে গড়ে মাত্র দেড় হাজারে। বর্তমানে যাতায়াতকারীদের মধ্যে বাংলাদেশি জটিল রোগী, শিক্ষার্থী ও ভারতীয় ল্যাগেজ পার্টির সংখ্যাই বেশি।

বেনাপোল থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিলোমিটার হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এই রুটটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ভ্রমণ কর বাড়লেও বন্দরে কাক্সিক্ষত যাত্রীসেবা বাড়েনি। তীব্র রোদ ও বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নেই। শৌচাগার ও বিশ্রামাগারের অবস্থাও শোচনীয়।

ভুক্তভোগী পাসপোর্টধারী শ্যামল কুমার রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঢাকা থেকে দ্রুত আসা গেলেও কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের ধীরগতির কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে ছিনতাই ও প্রতারণার শিকার হওয়ার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও রয়েছে অনেকের।

যশোর থেকে আসা অপর পাসপোর্টধারী যাত্রী মোছা. শাহিদা বেগম বলেন, আমার স্বামী লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য ভারতের ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডেট বা স্লট পেতেই আড়াই মাস সময় লেগে গেছে। জরুরি রোগীকেও যদি ভিসা পেতে এভাবে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? কাস্টমসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে ছিনতাই ও প্রতারণার শিকার হওয়ার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও রয়েছে অনেকের।

ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, আমাদের ব্যবসার কাজে প্রায়ই ভারতে যেতে হয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সুলতান মাহমুদ বিপুল জানান, দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ ও সীমান্ত অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে দ্রুত ভ্রমণ ভিসা স্বাভাবিক করা জরুরি।

বাংলাদেশ-ভারত চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মতিয়ার রহমান বলেন, ভিসাকেন্দ্রগুলো এখন কেবল সীমিত পরিসরে স্লট দিচ্ছে। ব্যবসা ও ভ্রমণ ভিসা না থাকায় বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন জানান, ভিসা জটিলতায় যাত্রী পারাপার কমায় বন্দরের রাজস্ব আয় অনেকটা কমে গেছে। তবে যাত্রীসেবা বাড়াতে এরই মধ্যে যাত্রীছাউনির জন্য জায়গা অধিগ্রহণের কাজ চলছে এবং নিরাপত্তা জোরদারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।