ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ইটভাটার ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত জনপদ

তাপস মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৬:৪৪ এএম

প্রথম প্রহরের আলো ফুটতেই বই-খাতা নিয়ে স্কুলের পথে হাঁটে শিশুরা। চোখে থাকে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কলাগাছিয়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় সেই স্বপ্ন প্রতিদিনই ঢেকে যাচ্ছে ইটভাটার কালো ধোঁয়ায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘মা ব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলাবালি ও ভারী যানবাহনের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এলাকার পরিবেশ, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইটভাটার মাত্র প্রায় ১০০ গজের মধ্যে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাটার পূর্ব পাশে অবস্থিত কলাগাছিয়া হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পশ্চিম পাশে পূর্ব কলাগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া কাছেই রয়েছে আব্দুল গনি দাখিল মাদ্রাসা, কাছেম গাজী কওমি মাদ্রাসা ও আউয়াল নূরানী মাদ্রাসা।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, ভাটাটির চারপাশে বসবাস করছে দুই শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন তাদের জীবন কাটছে ধোঁয়া, ধুলা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাটার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া প্রায়ই বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করতে পারে না। একাধিক অভিভাবক জানান, শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি, অ্যালার্জি ও চোখ জ্বালাপোড়ার সমস্যা বেড়ে গেছে। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে।

ভুক্তভোগী অভিভাবক ইদ্রিস কাজী বলেন, ইটভাটার কারণে ধুলাবালির সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সন্তানরা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় অটোরিকশাও চলতে চায় না।

ইটভাটার ধোঁয়ার প্রভাব পড়ছে কৃষি ও গাছপালার ওপরও। স্থানীয় বাসিন্দা মনির প্যাদা বলেন, তার বাগানের আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারি ও নারিকেলসহ কয়েকশ গাছের পাতা ধোঁয়ার কারণে ঝলসে যাচ্ছে। অনেক গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি জানান, তার বাবা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। দ্রুত ভাটাটি অপসারণ না করা হলে এলাকার পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইট ও মাটি বহনকারী ভারী ট্রলি ও ট্রাকের কারণে এলাকার সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মোটরচালক কালাম মল্লিক বলেন, ভাটা চালুর পর থেকেই সড়কের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছে। এতে যান চলাচলে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন আকন বলেন, ইটভাটার কারণে বাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং ভারী যানবাহনের কারণে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন-সংক্রান্ত প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির খুব কাছেই গড়ে উঠেছে এই ভাটা। ফলে কীভাবে এটি পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে মা ব্রিকসের পরিচালক মো. মন্টু মিয়া বলেন, তারা ভাড়ায় ভাটা পরিচালনা করছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে, তবে সেটি হালনাগাদ করা হয়নি। চুল্লির উচ্চতা ৬০ থেকে ৬৫ ফুট হওয়ায় ধোঁয়ার কারণে আশপাশের এলাকায় কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

বরগুনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মিছ তাসলিমা আক্তার বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ প্রতিদিন কালো ধোঁয়ার নিচে আরও একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে একটি জনপদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।