ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী ভবনগর গ্রাম। এই গ্রামে পা রাখলেই চোখে পড়বে এক অদ্ভুত ও চোখ জুড়ানো দৃশ্য। মানুষের হাত থেকে বাঁচতে বন্যপ্রাণী যখন লোকালয় এড়িয়ে চলে, তখন এই গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এক যুবকের কণ্ঠস্বর শুনলেই গাছের মগডাল আর বাড়ির ছাদ থেকে দল বেঁধে হুড়মুড় করে নেমে আসে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কালোমুখো হনুমানের দল। বোবা প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের এমন নিবিড় সখ্যের এক অনন্য নজির গড়েছেন স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমী যুবক নাজমুল হোসাইন।
বর্তমানে এই গ্রামে পাঁচ থেকে ছয়টি দলে বিভক্ত হয়ে ২০০টির মতো বিপন্নপ্রায় কালোমুখো হনুমান বসবাস করছে। আর বিগত ১০ বছর ধরে এই বিশাল হনুমানবহরের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন নাজমুল। প্রতিদিন সকালে নিজের কাজকর্ম দ্রুত শেষ করেই তিনি ছুটে যান বন্য বন্ধুদের খাবারের খোঁজে। নাজমুলের এক ডাকেই চারপাশ থেকে ছুটে আসে ক্ষুধার্ত হনুমানগুলো। পরম মায়ায় তাদের মুখে খাবার তুলে দেন তিনি।
তবে এই ভালোবাসার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না নাজমুলের জন্য। একসময়ের সবুজ ভবনগর গ্রামে এখন আগের মতো বড় বড় গাছপালা বা প্রাকৃতিক বনের অস্তিত্ব নেই। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। ক্ষুধার জ¦ালায় হনুমানগুলো প্রায়ই হানা দিচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের ফসলি জমিতে, নষ্ট করছে কষ্টার্জিত ফসল। এই নিয়ে কৃষকদের চরম ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে নাজমুলকে। স্থানীয় অনেকের ধারণা, নাজমুল যেহেতু এদের খাওয়ায়, তাই হনুমানগুলো তারই পোষা এবং তিনিই এলাকায় সংকট বাড়াচ্ছেন।
নাজমুল হোসাইন দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ১০ বছর আগে সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বোবা প্রাণীগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। ক্ষুধার্ত হনুমানগুলোকে যখন মানুষ মারধর করত, তখন বুকটা ফেটে যেত। চার বছর আগে বন বিভাগ থেকে সামান্য কিছু কলা, রুটি ও বাদামের বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা এই ২০০ হনুমানের জন্য সমুদ্রের মাঝে এক ফোঁটা পানির মতো। যে খাবার দেওয়া হয়, তা একটি দলেরই একবেলা ঠিকমতো হয় না। অন্তত একবেলা পর্যাপ্ত খাবার ও একটি নির্দিষ্ট বিচরণভূমির ব্যবস্থা করা হলে জীববৈচিত্র্যও বাঁচবে, কৃষকের ফসলও রক্ষা পাবে।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আশরাফ মেম্বার ও কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেক তাড়িয়েছি, কিন্তু এরা এলাকা ছেড়ে যায় না। খাবার না পেয়ে এরা আমাদের ফসল সাবাড় করছে। আমরা বন্যপ্রাণীগুলোর ক্ষতি করতে চাই না। সরকার যদি এদের খাবারের স্থায়ী ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা কৃষক এবং এই বোবা প্রাণী উভয়েই বাঁচতে পারি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারিভাবে প্রতিদিন ১৫ দশমিক ৪ কেজি কলা, ২ কেজি বাদাম, ২ কেজি রুটি ও ২ কেজি মৌসুমি ফল বা সবজি বরাদ্দ রয়েছে, যা এই বিশাল সংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তবর্তী এই গ্রামে বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব নিরসনে এবং বিপন্ন কালোমুখো হনুমানদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত টেকসই উদ্যোগ প্রয়োজন।
কোটচাঁদপুর বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ভবনগরের এই কালোমুখো হনুমানগুলো আমাদের দেশের অমূল্য সম্পদ। কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকারিভাবে খাবারের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

