চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক সাদ্রা দরবার শরীফের পীরজাদা হাম্মাদ চৌধুরী ও বাকী বিল্লাহ মিশকাত চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওমরাহ যাত্রীদের টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘এসবি ওভারসিজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওমরাহ করানোর কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি টাকা নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে যাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠানো হয়নি। পরে টাকা ফেরত চাইলে নানা টালবাহানা করা হয়।
এ ঘটনায় ওমরাহ কাফেলার প্রধান মাওলানা মো. গোলাম মাওলা চেক ডিজঅনারের মামলা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, তার মাধ্যমে ওমরাহ পালনের জন্য টাকা দেওয়া ৬৫ জন যাত্রী এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। একইভাবে আরও অনেক ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে, আদালতে দায়ের করা মামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা গেছে, কচুয়া উপজেলার আইনগিরি গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে মাওলানা মো. গোলাম মাওলা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ওমরাহ এজেন্সির মাধ্যমে যাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠানোর কাজ করে আসছেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে হাম্মাদ চৌধুরী ও মিশকাত চৌধুরীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পীরজাদা হিসেবে তাদের ওপর আস্থা রেখে ওমরাহ যাত্রী পাঠানোর বিষয়ে লেনদেন শুরু করেন তিনি। ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫ জন ওমরাহ যাত্রীর জন্য তিনি নগদ ও ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ৯৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেন।
গোলাম মাওলার অভিযোগ, লেনদেনের কিছু টাকা হাম্মাদ চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হয় এবং কিছু টাকা নগদে তার বাবা মুহাম্মদ যাকারিয়া চৌধুরীর কাছে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এর আগে কয়েকবার ওমরাহ যাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছি। তাদের অনুরোধে ২০২৫ সালে তাদের মাধ্যমে যাত্রী পাঠানোর কাজ শুরু করি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তারা যাত্রী পাঠাতে পারেননি। পরে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ‘এসবি ওভারসিজ’ নামে তাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো নিবন্ধন নেই।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘যাত্রীদের পাঠানোর কথা বলে তারা ভুয়া ভিসা ও এয়ার টিকিট দেন। টাকা ফেরতের বিষয়ে কথা বললে হাম্মাদ চৌধুরী ইসলামী ব্যাংকের দুটি চেক দেনÍএকটি ২০ লাখ টাকা এবং অন্যটি ২৫ লাখ টাকা। ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেক দুটি ডিজঅনার হয়। পরে বাধ্য হয়ে ঢাকার এমএম আদালতে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দুটি মামলা করেছি।’
গোলাম মাওলা জানান, মামলার নির্ধারিত তারিখে হাম্মাদ চৌধুরী আদালতে হাজির হননি। বর্তমানে হাম্মাদ ঢাকায় এবং মিশকাত বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ বিষয়ে তিনি চাঁদপুর জেলা প্রশাসককে মৌখিকভাবে এবং পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান। তিনি বলেন, ‘আমি সামাজিকভাবে চেষ্টা করেও টাকা উদ্ধার করতে পারিনি। যারা ওমরাহ করার জন্য আমার কাছে টাকা দিয়েছেন, তাদের টাকা ফেরত দিতে পারছি না। তাদের ওমরাহ পালনের স্বপ্নও পূরণ হচ্ছে না। আমি প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।’
এদিকে কুমিল্লার মুরাদনগরের আরেক ভুক্তভোগী নছরুল্লাহ হুসাইন অভিযোগ করেন, তার মাধ্যমে ১৭৬ জন ওমরাহ যাত্রীর ভিসা ও এয়ার টিকিটের জন্য মিশকাত চৌধুরী এবং তার দুই ভাই হাম্মাদ ও ইয়াহিয়া চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তারা ৭৫ লাখ টাকার দুটি চেক দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ না হওয়ায় আমি কুমিল্লা আদালতে মামলা করেছি। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাম্মাদ চৌধুরী ও মিশকাত চৌধুরীর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। তবে তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাদের পরিচয় দিয়ে বক্তব্য চেয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে হাম্মাদ ও মিশকাতের বাবা মুহাম্মদ যাকারিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক। তারা নিজেদের ব্যবসা করে। এসব বিষয়ে আমাকে কেন জড়ানো হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। মামলায় আমাকে জড়ানো হয়েছে। আমি কোনো নগদ টাকা গ্রহণ করিনি। এসব অভিযোগ মিথ্যা। এসব ঝামেলার কারণে আমি এখন ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখি না।’ ভুক্তভোগীরা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, টাকা উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন