সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বরিশালের জনজীবন। জেনারেশন ঘাটতির কারণে চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় রোটেশন পদ্ধতিতে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই বরিশাল নগরের জিলা স্কুলসংলগ্ন পরেশসাগর মাঠে গভীর রাত পর্যন্ত বাণিজ্য মেলা চলতে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক নাগরিক। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহিন।
গত মঙ্গলবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, আগামী ২ জুলাই এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। বিদ্যুতের অভাবে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ বাণিজ্য মেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যা জানতে চান তিনি।
নগরবাসীর অভিযোগ, বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। এতে অফিস-আদালতের কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আইসিইউ ওয়ার্ডও অনেক সময় অন্ধকারে ডুবে থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি, মোবাইলের আলো ও হাতপাখাই হয়ে ওঠে ভরসা। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটিতে বিপুল বরাদ্দ এলেও আইসিইউর জন্য কার্যকর বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার বলেন, তার আওতাধীন এলাকা ও ঝালকাঠি মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৯০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াট। নগরের একাংশেই চাহিদা রয়েছে প্রায় ৬৫ মেগাওয়াট। এই ঘাটতির কারণেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত মালাকার জানান, তার আওতাধীন এলাকায় চাহিদা ৪২ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২২ মেগাওয়াট। তার ধারণা, কোনো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিডের বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান পলাশ বলেন, জেনারেশন ঘাটতির কারণে বরিশালে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সহ-সভাপতি আব্দুর রশিদ নিলু বলেন, এ ধরনের ভয়াবহ লোডশেডিং কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিদ্যুৎ বণ্টনে সমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট অগ্রহণযোগ্য। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে গত ১৬ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের নাম ঘোষণা করা হয়।
দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আগামী জুলাই মাসে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় হাসপাতালের সার্বিক সেবা উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের সেবাগ্রহীতাদের মতামত নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে হাসপাতালটিকে এমনভাবে পরিচালনা করা হবে যাতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিজ এলাকায়ই পান এবং চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা অন্যত্র ছুটে যেতে না হয়।
বিদ্যুৎ সংকট, স্বাস্থ্যসেবায় বিঘœ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বরিশালের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি জরুরি সেবা খাতগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন