স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি বেকার তরুণ-তরুণীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে গাজীপুর মহানগরীর পূবাইলে অবস্থিত আঞ্চলিক জনসংখ্যা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (আরপিটিআই) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)। আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি একদিকে যেমন মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে গতিশীল করছে, অন্যদিকে দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে।
আরপিটিআই মূলত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, পরিবার কল্যাণ সহকারী, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং মাঠ পর্যায়ে কার্যকর সেবা প্রদানের কৌশলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শেখানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠ পর্যায়ে সেবার মানোন্নয়নে এই প্রশিক্ষণকর্মীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। আধুনিক কমিউনিকেশন স্কিল বা যোগাযোগ দক্ষতা শেখানোর ফলে তারা তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সঙ্গে সহজে মিশতে পারছেন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পরিবার পরিকল্পনা সেবা এখন অধিকতর কার্যকর।
এদিকে আরপিটিআই ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরেই অবস্থিত নিপোর্টে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে তিন মাসমেয়াদি ‘কেয়ার গিভার’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এটি বর্তমানে বেকার তরুণ-তরুণীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মাত্র এসএসসি পাস করেই এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী তাদের ক্যারিয়ারের নতুন পথ হিসেবে এটিকে বেছে নিচ্ছেন।
এই প্রশিক্ষণের আওতায় শিক্ষার্থীদের রোগীর পরিচর্যা, বয়স্কদের সেবা, প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং জরুরি সেবার বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। আধুনিক যুগে বয়স্ক সেবার প্রয়োজনীয়তা ও হাসপাতালগুলোতে সেবাকারীর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই প্রশিক্ষণের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। প্রশিক্ষণ শেষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, বৃদ্ধসেবা কেন্দ্র এবং পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, বিশ্বব্যাপী প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ায় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ‘কেয়ার গিভার’দের বিপুল চাহিদা রয়েছে, যা আমাদের দক্ষ যুবশক্তির বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে।
প্রশিক্ষণার্থী মিম ও হোসাইন মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি এই ধরনের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ তাদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলেন, এটি আমাদের শুধু চাকরির নিশ্চয়তাই দিচ্ছে না, বরং পরিবার ও সমাজের যেকোনো জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় আমরা এখন অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানের জন্যই নয়, বরং মানবিক সেবার মানসিকতা থেকেও এই পেশাকে গ্রহণ করছেন।
প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাকলী খাতুন বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কোনো বিকল্প নেই। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের এমনভাবে গড়ে তুলছি যাতে তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে। বর্তমানে আমরা প্রশিক্ষণের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি, যাতে আরও বেশিসংখ্যক তরুণ-তরুণী স্বল্প খরচে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।
তিনি আরও যোগ করেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণসমাজকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করুক এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহে ভূমিকা রাখুক।

