ঢাকা রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

সবুজ লতায় ঝুলছে স্বপ্ন

আল-আফতাব খান সুইট, বাগাতিপাড়া
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

মাচার পর মাচাজুড়ে সবুজ লতায় ঝুলছে অসংখ্য পটোল। ভোরের আলো ফুটতেই খেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষকেরা। একসময় যে জমিতে ধান ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের আবাদ হতো, এখন সেই জমির বড় অংশজুড়ে হচ্ছে পটোল চাষ। অধিক লাভ, সারা বছর বাজারে চাহিদা এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির কারণে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ সবজির চাষ।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাগাতিপাড়ায় বছরে প্রায় ১ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়। এর মধ্যে চলতি খরিফ-১ মৌসুমে ৫৬ হেক্টর জমিতে পটোল আবাদ হয়েছে। গত বছর তিন মৌসুম মিলিয়ে ১১১ হেক্টর জমিতে পটোল চাষ হয়েছিল। অর্থাৎ, চলতি বছর এক মৌসুমেই গত বছরের মোট আবাদকৃত জমির প্রায় অর্ধেক এলাকায় পটোল চাষ হয়েছে। উপজেলার সব ইউনিয়নেই কমবেশি পটোলের আবাদ থাকলেও দয়ারামপুর ইউনিয়নে এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

কৃষি বিভাগ জানায়, নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষকদের ফেরোমন ফাঁদ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এতে কীটনাশকের ব্যবহার কমে এবং উৎপাদিত সবজির গুণগত মান বজায় থাকে। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে পটোল চাষ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর বেলে-দোআঁশ মাটি এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণে এ অঞ্চলে পটোলের ভালো ফলন হচ্ছে। প্রতি বিঘা জমিতে পটোল চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ ও মাচা তৈরিসহ প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে নাইননের সুতা দিয়ে তৈরি মাচা একবার তৈরি করলে তা তিন থেকে চার বছর ব্যবহার করা যায়। ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন খরচ কমে আসে।

কৃষকদের ভাষ্য, সারা বছর বাজারে পটোলের চাহিদা থাকায় উৎপাদিত ফসল বিক্রি নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা থাকে না। সঠিক পরিচর্যা করলে প্রতি বিঘা জমি থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। এ কারণে অন্য ফসলের তুলনায় পটোল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

পাঁকা ইউনিয়নের স্বরাপপুর গ্রামের কৃষক বাদশা আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি দেড় বিঘা জমিতে পটোল চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি ৫০ হাজার টাকার পটোল বিক্রি করেছেন। মৌসুম শেষে প্রায় এক লাখ টাকার পটোল বিক্রির আশা করছেন তিনি।

সদর ইউনিয়নের আরজুমারিয়া-নওশেরা এলাকার কৃষক পলাশ কুমার বলেন, নদী অববাহিকার বেলে-দোঁআশ মাটিতে পানি জমে না, তাই এ এলাকায় সবজি চাষের পরিবেশ অনুকূল। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পটোল চাষ করছেন। বর্তমানে বাজারদর কিছুটা কম থাকলেও মৌসুমজুড়ে ভালো দাম পাওয়া যায়, যা কৃষকদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

দয়ারামপুর ইউনিয়নের চিবনাপুর গ্রামের কৃষক আবু হাসান বাপ্পি জানান, আগে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করলেও লাভ কম হওয়ায় কয়েক বছর ধরে পটোল চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে ৭ কাঠা জমিতে পটোল আবাদে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার টাকার পটোল বিক্রি করেছেন। বাজারদর ভালো থাকলে এ মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পটোল বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি পটোল ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের মতে, এখন দাম কিছুটা কম থাকলেও মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়া গেছে। বর্ষা মৌসুমে দাম বাড়ার আশা করছেন তারা। এ কারণে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে পটোল চাষের পরিকল্পনা করছেন অনেক কৃষক।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ভবসিন্ধু রায় বলেন, কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পটোল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আইপিএম পদ্ধতি, ফেরোমন ফাঁদসহ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চলতি খরিফ-১ মৌসুমে উপজেলায় ৫৬ হেক্টর জমিতে পটোলের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ভবিষ্যতে পটোল চাষ এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আরও লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ফসলে পরিণত হবে।