× UCB Sticker Card
রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

শার্শার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে খাস জমি রেজিস্ট্রি, রাজস্ব ফাঁকি, দলিলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

যশোরের শার্শার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি, দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমের বিরুদ্ধে অবশেষে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা নিবন্ধন অধিদপ্তরের টেলিফোনিক নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় তাকে শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।

রোববার (২১ জুন) জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশনার আলোকে শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে অবিলম্বে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।

জানা গেছে, শার্শার গোগা ইউনিয়নের সেতাই গ্রামের ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শার্শা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক ও সিন্ডিকেটের মূলহোতা বুলবুল হোসেন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজসে সরকারি জমি বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।

জমির ক্রেতা আফসার আলী জানান, তিনি কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করতে না পেরে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা দিয়ে জমিটি কিনেছেন। পরে তিনি জানতে পারেন জমিটি সরকারি খাস সম্পত্তি। এ ছাড়া, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি দলিলে জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে কমমূল্যে রেজিস্ট্রি করা হয়। অর্থাৎ, বছরে প্রায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার দলিলে অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকার স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন ফি এবং কর বাবদ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।

২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সম্পাদিত তিনটি দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকৃত মূল্য গোপন করে খুবই কম দেখানো হয়েছে। কবলা দলিল নং-২৩১২ অনুযায়ী বালুন্ডা মৌজার ২৫ শতক জমির মূল্য দেখানো হয় মাত্র তিন লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অথচ, অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় ২৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে বাগান শ্রেণির জমিকে ধানিজমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু এই একটি দলিলেই মূল্য গোপন করা হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা।

একই দিনে সম্পাদিত দানপত্র দলিল নং-২৩৬৪-এ বরুজবাগান মৌজার ১১ শতক জমির মূল্য দেখানো হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা। প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ১৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ। জমিটি পূর্ববর্তী দলিলে ডাঙা শ্রেণির হলেও পরবর্তীতে ডোবা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অপরদিকে, কবলা দলিল নং-২২৯২-এ বুরুজবাগান মৌজার তিন দশমিক ২৬ শতক জমির মূল্য দেখানো হয়েছে এক লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় এখানে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে। একইভাবে ডাঙা শ্রেণির জমিকে ডোবা দেখিয়ে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু এই তিনটি দলিলেই মোট ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা মূল্য কম দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি মাত্র একটি দিনের তিনটি দলিলে এতো বড় অঙ্কের মূল্য গোপন করা হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘ ১৫ মাসে নিবন্ধিত শত শত দলিলের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

অভিযোগ রয়েছে, গত প্রায় ১৫ মাসে অর্ধশতাধিক খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি হয়েছে। এসব জমির বেশিরভাগই সরকারি খতিয়ানের আওতাভুক্ত হলেও বিভিন্ন কৌশলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এ ছাড়া দানপত্র, হেবা, ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা হস্তান্তর, বিনিময় দলিল এবং ভ্রম সংশোধন দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, দানপত্র বা হেবা ঘোষণাপত্রের ক্ষেত্রে প্রতি শতক জমির জন্য পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, বিনিময় দলিল কিংবা ভ্রম সংশোধন দলিলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকী দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটেছে।

সাব-রেজিস্ট্রার শাহিন আলম ২০২৫ সালের ৩ মার্চ ঝিকরগাছা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। পরে তিনি শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। এক ব্যক্তি একসঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন করায় তখন থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও দীর্ঘদিন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়ম আরও বেড়ে যায়।

এদিকে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ (বিচার শাখা-৬) বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়মের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ওপেন সিক্রেট হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গোগা ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগও নতুন নয়। মানুষ সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃশ্যমান শাস্তি দেখতে চায়।

শার্শা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম বাবু বলেন, খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত ছিল। প্রশাসন যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটি ইতিবাচক। তবে শুধু দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নয়, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার শাহিন আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে অস্বীকার করেন। এ সময় শার্শা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক ও সিন্ডিকেটের মূলহোতা বুলবুল হোসেনও সংবাদকর্মীদের বাধা প্রদান করেন।

জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব বলেন, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তাদের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেছেন, সরকারি খাস জমি রাষ্ট্রের সম্পদ। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়া এসব জমি হস্তান্তরের সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Link copied!