বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলাকালেই তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে একই রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিল পরিশোধের অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলকে খাবারের বিল পরিশোধ করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কৃষকসহ সচেতন মহল।
গত ২০ জুলাই দৈনিক রুপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় চিতলমারী উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম চলাকালেই গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) চিতলমারী বাজারের একটি রেস্টুরেন্টে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ফকিরহাট উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিহার রঞ্জন সমাদ্দার, সদস্য শরণখোলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মাসুম বিল্লাহ, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কারিগরি খাদ্য পরিদর্শক আদুরী রাণী ব্রহ্ম, চিতলমারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. কাওছার আহমেদ, বাগেরহাট থেকে যাওয়া মিলার এমদাদ পাইক এবং অভিযোগের মুখে থাকা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মুহাইমিনুল একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করেন।
রেস্টুরেন্ট-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই সময় প্রায় ৪ হাজার টাকার খাবার পরিবেশন করা হয়। একই সূত্রের দাবি, রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলকে খাবারের বিল পরিশোধ করতে দেখা গেছে।
ঘটনাটি প্রকাশের পর স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে, তদন্ত চলাকালেই তার সঙ্গে তদন্তকারীদের একসঙ্গে খাবার খাওয়া এবং তার মাধ্যমে বিল পরিশোধের অভিযোগ তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে তদন্ত প্রতিবেদন কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কারিগরি খাদ্য পরিদর্শক আদুরী রাণী ব্রহ্ম বলেন, আমি অভিযুক্ত ব্যক্তির টাকায় খাবার খাইনি। কমিটির আহ্বায়ক আমাকে সেখানে নিয়ে গেছেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুল ক্যাশ কাউন্টারে বিল পরিশোধ করেছেন এ বিষয়টি আমি অস্বীকার করছি। এ ছাড়া আমি অ্যাঞ্জেল মিলের মালিক এমদাদ পাইককে সঙ্গে নিয়ে তার গাড়িতে গিয়েছি।
এদিকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলের সঙ্গে মিলার এমদাদ পাইকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এমদাদ পাইকের মিল থেকে চিতলমারী খাদ্য গুদামের জন্য চাল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সেই সম্পর্কের কারণেই তদন্ত চলাকালে তাকে তদন্ত কমিটির সঙ্গে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্রটির দাবি, বিষয়টি দফারফার উদ্দেশ্যেই এমদাদ পাইককে তদন্ত কমিটির সঙ্গে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা দিলোয়ার হোসেন বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে আপ্যায়ন গ্রহণ করা ঠিক হয়নি। আপনাদের প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, চিতলমারী উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাইমিনুলের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে তদন্ত চলাকালেই অভিযুক্ত কর্মকর্তার সঙ্গে তদন্ত কমিটির সদস্যদের একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ এবং বিল পরিশোধের অভিযোগ সামনে আসায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

