ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

মেরিন ড্রাইভে রেন্ট-এ-বাইক সিন্ডিকেট, মাসে ৩ লাখ টাকা মাসোহারার অভিযোগ

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রিক মেরিন ড্রাইভ সড়কজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ রেন্ট-এ-বাইক সিন্ডিকেট। রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে শতাধিক পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন শত শত নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রবিহীন মোটরসাইকেল ভাড়া দেওয়া হচ্ছে পর্যটক ও স্থানীয়দের কাছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ এবং হিমছড়ি ও ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। এর বিনিময়ে মাসে প্রায় তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা পয়েন্ট, কলাতলী মোড়, বেলী হ্যাচারি, জমজম হ্যাচারি থেকে শুরু করে পুরো মেরিন ড্রাইভজুড়ে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেন্ট-এ-বাইক স্ট্যান্ড। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত শতাধিক ব্যক্তি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তিন শতাধিক মোটরসাইকেল, যার বড় অংশেরই বৈধ নিবন্ধন, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব মোটরসাইকেলের অনেকগুলো সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে দেশে আনা হয়েছে।

এভাবে অবৈধ মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন হাজারো পর্যটক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেল ভাড়া নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স চাওয়া হয় না। অনেকেই হেলমেট ছাড়াই চলাচল করছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কলাতলীর ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সামনে কথা হয় পাবনা থেকে বেড়াতে আসা কলেজশিক্ষার্থী রিয়াজ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি জানান, তিন ঘণ্টার জন্য দেড় হাজার টাকায় একটি ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল ভাড়া নেন। কাগজপত্র দেখতে চাইলে ব্যবসায়ী তাকে বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তি আছে, কোনো জায়গায় সমস্যা হবে না।’

রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর কথা চিন্তাও করা যায় না। কিন্তু কক্সবাজারে এসে দেখলাম কাগজপত্র ছাড়াই অবাধে মোটরসাইকেল চলছে। অনেকেই হেলমেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই চালাচ্ছেন।’

ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী রবিন হাওলাদার জানান, ঘণ্টাপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানোর সময় হিমছড়ি এলাকায় পুলিশ তাকে থামায়। পরে মোটরসাইকেলের মালিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, পুলিশের সঙ্গে তাদের মাসিক সমঝোতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেন্ট-এ-বাইক ব্যবসায়ী দাবি করেন, অবৈধ মোটরসাইকেল পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা সংগ্রহ করা হয়। মাস শেষে সমিতির কয়েকজন নেতা বা পুলিশের সোর্স সেই টাকা ট্রাফিক পুলিশের কলাতলী বক্স, হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ি, ইনানী পুলিশ ফাঁড়ি এবং রেজুখাল চেকপোস্টে পৌঁছে দেন। তবে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

অভিযোগের বিষয়ে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক সোমনাথ বসু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব। ফাঁড়ি পুলিশ এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করে না। মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’

রামু থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’

কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) খসরু পারভেজ বলেন, ‘লাইসেন্সবিহীন ও অবৈধ মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।’ তবে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় সাম্প্রতিক কোনো অভিযানের নির্দিষ্ট তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভে অবৈধ মোটরসাইকেল চলাচলের বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পেয়েছি। দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। তদন্তে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সড়ক মেরিন ড্রাইভে এভাবে অবৈধ মোটরসাইকেল চলাচল শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্যই নয়, পর্যটকদের নিরাপত্তা, সড়ক শৃঙ্খলা এবং সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধ রেন্ট-এ-বাইক সিন্ডিকেট উচ্ছেদে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হোক।