রাতের অন্ধকার নামলেই চারদিকে শুরু হয় রাক্ষুসে ছোট ফেনী নদীর গর্জন। সেই গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ৪টি আশ্রয় কেন্দ্রের প্রায় ৫ শতাধিক পরিবারের মানুষগুলোর বুকের কাঁপন। চোখের সামনে নিজের বসতভিটা, ফসলি জমি আর তিল তিল করে জমানো স্বপ্নগুলো নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে শত শত পরিবার। এসব মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশের আকাশ বাতাস।
আশ্রয়কেন্দ্রের এক কোণে বসে ডুকরে কাঁদছিলেন ষাটোর্ধ্ব বিবি খতিজা। নদী তার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়ার দারপ্রান্তে।
তিনি বলেন, ‘আগেও নদী ভাঙনে আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলিন হওয়ার পর এ আশ্রয় কেন্দ্রে ২০ থেকে ২৫ বছর আমরা বসবাস করছি। এখন আবার নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি সব চলে যায়। এখন থাকার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। পরিবারে ১০ থেকে ১২ জন থাক নেওয়ালা আছে। এখন আমরা কই যামু।’
বিবি ছলিমা নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের সব নদী ভেঙে নিয়ে যাইতেছে। আমাদের থাকার মত কোনো ব্যবস্থা নাই। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা কই যামু, কই থাকমু।’
আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের চোখেমুখে শুধু অনিশ্চয়তার ছাপ। ভাঙন আতঙ্ক এখনো তাদের পিছু ছাড়েনি। নদী যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে এই আশ্রয়কেন্দ্রটি কতক্ষণ টিকে থাকবে, তা নিয়েও জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। পুরুষরা নদীর পাড়ে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। আর মহিলারা শিশুদের নিয়ে কোনো মতে রাত পার করছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্রটি প্রায় ৫-১০ গজ দূরে নদী। জোয়ার পরবর্তীকালে ভাটায় ধরেছে ভাঙন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সপ্তাহ আগেও নদী ছিল আরও ১-২০ গজ দূরে। সপ্তাহের ব্যবধানে ৫-১০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। জানি না ২-৪ দিনের ভিতর কী অপেক্ষা করছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি অবগত করলেও এখনো পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু মুসা বলেন, আমি বিষয়টি অবগত হয়েছি ও সরেজমিনে গিয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ এর একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, নদীর তীব্র ভাঙন ও আশ্রয় কেন্দ্রের আহাজারি দেখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিগ্যান চাকমাসহ সিনিয়র নেতাদের জানিয়েছি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার একাধিকবার সরজমিনে এসেছে। তিনি আমার উপস্থিতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আবারও প্রায় ৫শ পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে।
উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক খুরশিদ আলম ভূঞা বলেন, আমি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিগ্যান চাকমাসহ সরজমিনে গিয়েছি। আশ্রয় কেন্দ্রের মানুষদের আহাজারি দেখেছি। বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমি আমাদের এমপি (বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী) আবদুল আউয়াল মিন্টু অফিসকে এ ব্যাপারে অবগত করেছি। আশা করি, ভাঙনের গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিগ্যান চাকমা বলেন, আমি এর আগেও সরজমিনে এসেছি। গতবার এসে যা দেখেছি তখনকার চিত্র আর বর্তমান চিত্র অনেক পার্থক্য। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক জায়গা ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙন রোধে কী করা যায়। সেই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কাজ করছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্ভব হবে।

