ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

শীতে ব্যাহত বেনাপোল বন্দরের কার্যক্রম, সংকটে নিম্নবিত্তরা

বেনাপোল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
তীব্র শীতেও কাজে নেমেছে বেনাপোল বন্দরের শ্রমিকরা। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

টানা শীতের দাপটে উত্তরের হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যশোরের শার্শায়। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত জনজীবন কার্যত স্থবির। শীতের দাপটে বেনাপোল বন্দরের শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—সবার জবুথবু অবস্থা। যশোরে টানা দশ দিন ধরে শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। একদিকে শীতের দাপট, অন্যদিকে কুয়াশা আর হিমেল হাওয়া দুর্ভোগের মাত্রাও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত দশ দিন ধরেই যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।

আজ সোমবার সকালে কিছু সময় সূর্যের দেখা মিললেও আবারও কুয়াশায় ঢেকে পড়ে চারপাশ। উত্তরের বাতাস যুক্ত হওয়ায় হাড়কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে।

যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রোববার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে শনিবার ভোরে যশোরে সর্বনিম্ন ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আর শুক্রবার ভোরে সর্বনিম্ন ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার এই তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কুয়াশায় সূর্যের দেখা না মেলা এবং উত্তরের বাতাসের কারণে শীত অনুভূত হচ্ছে তীব্র। সোমবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকৃতি ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। ফলে মানুষের স্বাভাবিক কর্মকা‌ণ্ড ব্যাহত হয়। মোটা জ্যাকেট ও মাফলারে ঢেকে মানুষজনকে জবুথবু হয়ে চলাফেরা করতে দেখা যায়। হাড়কাঁপানো শীতে অনেকেই ঘর থেকে বের হননি। এখন সকাল ও বিকেলেও শীতের দাপট অনুভূত হচ্ছে। আর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হচ্ছে অসহ্য শীতের কাঁপুনি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়ছে শীতের তীব্রতা। বেশি দুর্ভোগে পড়ছে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো।

শার্শা উপজেলায় প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে অন্তত ৪৫-৫০ শতাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা মূলত দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার মানুষ কাজ ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আসা-যাওয়া করেন। শীতের কারণে ভোরের শিফটে কাজ করা শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। শীতের কারণে বন্দর ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কামাল উদ্দিন শিমুল বলেন, ‘শ্রমিক সংকট ও ধীরগতির কারণে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে।’

বন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভোরবেলা এত ঠান্ডা থাকে যে কাজ শুরু করতেই কষ্ট হয়। কাজ না করলে পরিবার চালানো যায় না।’

আরেক শ্রমিক তুহিন মিয়া বলেন, ‘হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আগুন পোহাতে পোহাতে কাজ করতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।’

জুলেখা বেগম নামে শার্শার এক গৃহবধূ বলেন, ‘বাচ্চা ও বয়স্কদের জন্য এই শীত অসহনীয়। ওষুধ ও গরম কাপড় অনেকের পক্ষে কেনা সম্ভব না। শীত আমাদের জন্য বড় মানবিক সংকট সৃষ্টি করছে।’

স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শীতজনিত রোগ—সর্দি-কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট—বেশি দেখা যাচ্ছে।

শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক পারভেজ জানান, হাসপাতালে আসা রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশই শিশু ও বৃদ্ধ।

তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত গরম কাপড়, ওষুধ ও সঠিক পরিচর্যা ছাড়া এই বয়সের মানুষ শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’

ঠান্ডা ও কুয়াশার প্রভাবে কৃষিকাজও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। আলু, শর্ষে ও অন্যান্য ফসলের খেতে চাষিরা কাজ করতে না পারায় উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানিয়েছেন, বোরো, আলু, সর্ষে ও অন্যান্য ফসলের বীজতলা কুয়াশা ও শীতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শৈত্যপ্রবাহ এবং ঘন কুয়াশার কারণে মৌ-খামারিদের মধু সংগ্রহেও প্রভাব পড়তে পারে। কৃষকদের সতর্কতা ও করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ বলেন, ‘শীতের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে।’