ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যশোর-১ আসনে বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

বেনাপোল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ১১:২০ এএম
নুরুজ্জামান লিটন ও মাওলানা আজীজুর রহমান। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যশোর-১ (শার্শা) আসনে রাজনীতির মাঠে বাড়ছে উত্তাপ। সীমান্ত জনপদ শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল অবস্থিত। তিন লাখ ১১ হাজার ভোটারের এই আসনে এবার মুখোমুখি হচ্ছেন দুই হেভিওয়েট প্রার্থী। ইতোমধ্যে দুই প্রার্থীই সমানতালে নিজেদের নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভোটের মাঠে প্রভাবশালী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থীকে ঘিরে স্থানীয় জনপদে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটের দুইজন প্রার্থী থাকলেও এলাকায় তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই। এই দুই প্রার্থীর প্রচার মূলত মাইকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সব রাজনৈতিক দলের কাছেই আসনটির গুরুত্ব বেশি। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি তিনবার এবং স্বতন্ত্র ও জামায়াত একবার করে বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই মাঠে নেমেছেন প্রার্থীরা। প্রতীক হাতে পেয়ে নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মনোনীত প্রার্থীরা।

এই আসনে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত অনুপস্থিত থাকায় নির্বাচনি প্রতিযোগিতা মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের সাংগঠনিক কার্যক্রম মাঠে নেই বললেই চলে। হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের পর যশোর-১ আসনে বিএনপি-জামায়াতের পুনরুত্থানকে রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জনগণের আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘ দমন-পীড়নের ইতিহাস এবং বিরোধী দলগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আসনটি এখন পরিণত হয়েছে একটি ‘নির্বাচনি হটস্পটে’।

এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার তিন লাখ ১১ হাজার ৬৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮০৭ জন, নারী ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮২৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার রয়েছেন ৩ জন। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীরা ভোট দিতে পারলে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপি না জামায়াত—কোনো প্রার্থীর পক্ষে যাবে, সে হিসাব-নিকাশ করছে দুই দলই। ফলে আসনটি বিএনপি না জামায়াত—কার দখলে যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও আলোচনা চলছে।

এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন চার নেতা। প্রথমে দল মনোনয়ন দেয় সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে। পরে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন। জামায়াতে ইসলামীর একমাত্র প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান।

একক প্রার্থী হওয়ায় নিজের অবস্থানে আত্মবিশ্বাসী মাওলানা আজীজুর রহমান। ইতোমধ্যে তার পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে, নুরুজ্জামান লিটনের পক্ষে মাঠে রয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রকাশ্য সভা, কেন্দ্রভিত্তিক কর্মিসভা, আলোচনা-মতবিনিময় ও অনলাইন প্রচারসহ সব ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা।

শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তরুণ নেতা নুরুজ্জামান লিটন তরুণ ভোটারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক মামলায় কারাবরণ করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ না থাকায় তিনি একজন ‘পরিচ্ছন্ন’ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।

নুরুজ্জামান লিটন বলেন, তিনি ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করায় তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

অন্যদিকে, ১৯৮৬ সালে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট নূর হুসাইন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মাওলানা আজীজুর রহমান। সে নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ আফিল উদ্দিনের কাছে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এবার তিনি জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এবং সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতা থাকার দাবি করছেন।

মাওলানা আজীজুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন দমন-পীড়নের মধ্যেও সংগঠনের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। এবার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চোরাচালানমুক্ত শার্শা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন তারা।

শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। যোগাযোগব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হলেও এখনো অনেক এলাকায় কাঁচা রাস্তা রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেসব রাস্তা কাদায় পরিণত হয়। পাশাপাশি চোরাচালান ও সন্ত্রাস সীমান্ত এলাকার বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এসব ইস্যুকেই নির্বাচনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন প্রার্থীরা।

পক্ষ-বিপক্ষ, মত-দ্বিমত ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে যশোর-১ আসনের নির্বাচনি পরিবেশ। ভোটারদের ধারণা, এবার এখানে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। শেষ পর্যন্ত কে অপরাজিত থাকবেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত।