ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

লালমনিরহাটে ধানের ফলনে খুশি চাষিরা, দামে হতাশ

কালীগঞ্জ (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

প্রকৃতি আর বাজার—দুই দিক থেকেই অনিশ্চয়তার মুখে লালমনিরহাটের কৃষকেরা। একদিকে মাঠজুড়ে সোনালি ধান, অন্যদিকে আকাশজুড়ে কালো মেঘ। ধান ঘরে তোলার এমন সময়ে কৃষকের হতাশা আরও বাড়িয়েছে বাজারদর। কৃষকেরা বলছেন, ধান বিক্রির দামে তাদের উৎপাদন খরচই উঠছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে লালমনিরহাটে ৪৮ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১০ হেক্টর বেশি। এর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু অনিশ্চিত আবহাওয়া সেই সোনালি স্বপ্নকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে।

কোথাও কৃষকেরা ধান কাটতে সাহস পাচ্ছেন না, আবার কোথাও কাটা ধান আচমকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছে। পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জমির ধান কাটার উপযুক্ত হলেও কৃষকেরা অপেক্ষা করছেন আকাশ পরিষ্কার হওয়ার জন্য।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাঝেও সোনালি স্বপ্ন ঘরে তুললেও দাম নিয়ে বড় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কৃষকদের কপালে। এবার বোরো চাষাবাদের শুরু থেকেই তেল আর সার উচ্চদামে সংগ্রহ করতে হয়েছে কৃষকদের।

যে কারণে উৎপাদন খরচ বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশি। চলতি মৌসুমে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়ছে সাড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। আলু আর তামাকের লোকসানের পর বোরোতেও লোকসান গুনে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাও দিচ্ছেন অনেক চাষি।

আদিতমারীর ভাদাই গ্রামের কৃষক সবুর মণ্ডল বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে ধান পেকে গেছে। কিন্তু এখন কেটে ফেললে যদি বৃষ্টি হয়, শুকাতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি নিতে পারছি না।’

কালীগঞ্জের কাকিনা চাপারতল গ্রামের আহেদুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের দাম কম, আর খরচ অনেক বেশি। ধান উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক, কাটা, বাঁধা, বাড়িতে আনা আর মাড়াই মিলিয়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকার মতো খরচ হচ্ছে। ধান বিক্রি করে মিলছে মাত্র ১১ হাজার টাকা। এর আগে আলু আর তামাকে লোকসান হয়েছে। এখন ধানেও লোকসান। এমন লোকসান হলে কৃষকেরা বাঁচবে কীভাবে?’

সদর উপজেলার কালমাটি গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করে সার আর তেল বেশি দামে কিনতে হয়েছে। এখন সেই ধানেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকার দাম নির্ধারণ করেছে প্রতি মণ ১ হাজার ৪০০ টাকা। বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। চাষাবাদ করে কৃষকেরা লোকসান গুনলেও লাভবান হচ্ছেন ফড়িয়া আর মজুতদারেরা। এমন হলে চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে।’

কাকিনা চর রুদ্রেশ্বর গ্রামের কৃষক আছমত আলী বলেন, ‘এই এক বিঘা ধানই আমার সারা বছরের ভরসা। ধানে ফলন ভালো হয়েছে ঠিকই, তবে দাম নেই। বাজারে গেলে ধানের দামই বলতে চায় না। উৎপাদন খরচ পড়ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ।’

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। মাড়াই মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ধান বাঁচাতে ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই কর্তনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ধান শুকানোর পর সরকারি গুদামে বিক্রি করলে কৃষকদের লোকসান নয়, লাভ হবে। কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে খাদ্য বিভাগে আমরা কৃষকদের তালিকাও দিয়েছি।’