× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১০:১১ পিএম

ময়মনসিংহে মাজার-খানকা ভাঙচুর

মামলাতেই কাজ শেষ পুলিশের; হয় না তদন্ত, নেই গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১০:১১ পিএম

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

ময়মনসিংহে পৃথক তিনটি মাজার ও খানকা ভাঙচুরের ঘটনায় মামলার পর কোনো আসামি গ্রেপ্তার বা তদন্ত না করার অভিযোগ করছেন মামলার বাদী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এসব ঘটনার সঠিক তদন্ত করে আসামি গ্রেপ্তার করলে বারবার মাজারে হামলা বা হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না। এসব ঘটনার জন্য মব সন্ত্রাসকেও দায়ী করছেন তারা।

সুত্র মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর থেকে সারা দেশে মাজার ও দরগাহে হামলার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টির বেশি (৯৭ থেকে ১১৩টি) মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।

সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ-এর তথ্যমতে, আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ১৭ মাসে ৯৭টি মাজার হামলার শিকার হয়েছে। ৪ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে ১৯ মাসে শতাধিক মাজার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

মাজার ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, সম্পত্তি লুটপাট এবং ভক্তদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ধারাবাহিক মাজার ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে এবং এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

গত বছরের ৮ জানুয়ারি রাতে ময়মনসিংহ নগরীর থানার ঘাট এলাকার ২০০ বছরের পুরোনো হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.) এর মাজারের বাৎসরিক ওরসের কাওয়ালি অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে।

সূত্র জানায়, হজরত শাহ সুফী সৈয়দ কালু শাহ (রহ) এর মাজারে ১৭৯তম বার্ষিক ওরস উপলক্ষে ব্রহ্মপুত্র নদের পারে কাওয়ালি গানের আয়োজন করেন ভক্তরা। ঘটনার দিন রাত ১১টার দিকে গানের অনুষ্ঠান শুরুর পর সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে হামলা হয়। দ্রুত শিল্পীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। মঞ্চ ও চেয়ার গুঁড়িয়ে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে রাত ৩টার দিকে মাজারে আবারও হামলা হয়। মাজারের পাকা স্থাপনার কিছু অংশ ও ভেতরে থাকা জিনিসপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

মাজারের অর্থ সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান বলেন, মাজারটিতে ১৭৯তম বাৎসরিক ওরস উপলক্ষে মিলাদ ও গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। তিন-চারটি গান হওয়ার পরই হঠাৎ থানার ওসি এসে লোকজনকে দ্রুত সরে যেতে বলেন। এর মধ্যে বড় মসজিদের শিক্ষার্থীরা এসে হামলা চালিয়ে পণ্ড করে দেয় কাওয়ালির আসর। পরে রাত ৩টার দিকে মাজারে আবারও হামলা করে গুঁড়িয়ে দেয়। 

ঘটনার পর দিন কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আমাকে ফোন করে থানায় যেতে বলেন। পরে আমি থানায় গেলে ওসি আমাকে একটি কাগজে সাক্ষর করতে বলেন। তবে, ওই কাগজটি মামলার কপি কিনা তা-ও দেখার সুযোগ পাইনি। পরে কাগজ হাতে নিয়ে দেখি এটি মামলার কপি। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ছিল এক হাজার থেকে দেড় হাজার।

তিনি আরও বলেন, মামলার পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো আসামিও গ্রেপ্তার করেনি। পরে আদালতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারছি। কোনো আসামি গ্রেপ্তার বা তদন্ত ছাড়াই মামলা আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশের এমন অবহেলার কারণে দেশব্যাপী মাজার ভাঙচুর, হত্যার মতো ঘটনা বেড়েই চলছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে নিয়মিত প্রতিবাদ করে যাচ্ছি এবং প্রতিবাদ করে যাব।

মাজারসংশ্লিষ্ট নুর আলী বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে খানকায় হামলা ও ভাঙচুর হয়। এই ঘটনায় মামলাও হয়। পুলিশ নিজেরাই মামলা লিখে খাদেমকে স্বাক্ষর দিতে বলেন। তবে, মামলার কোনো দিন পুলিশ তদন্ত করতে যায়নি। এমনকি এখনো কোনো আসামি পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। যে কারণে দেশে মাজারে হামলা ভাঙচুর হত্যার মতো ঘটনা ঘটেই চলছে। এসব ঘটনার সঠিক তদন্তে করে আসামিদের আইনের আওতায় আনলে এমন ঘটনা ঘটত না।

একই বছরের ২৫ ডিসেম্বর রাতে জেলার গৌরীপুর উপজেলার টেঙ্গাপাড়া গ্রামে কয়েক শত বছরের পুরোনো শাহজাহান উদ্দিন (রহ.) আউলিয়া নামে মাজার ভাঙচুর ও মল-মূত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

পর দিন ২৬ ডিসেম্বর ভোরে মাজারে গিয়ে বেশ কয়েকজন ভক্ত দেখতে পান, মাজারের মূল অংশের বাউন্ডারি ভেঙে পড়ে আছে। তা ছাড়া মাজারের বিভিন্ন স্থানে মানুষের মলমূত্র ও গোবর ছড়িয়ে রয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে মাজারে শত শত লোক ভিড় করেন। তারা ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান।

পরে ওই দিন মাজারের খাদেম মো. সাইদুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয়দের আসামি করে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জুয়েল মিয়া জানান, মাজার ভাঙচুর ও মুলমূত্র নিক্ষেপের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছিল। ওই মামলা হওয়ার পর পুলিশকে কোনো দিন তদন্ত করতে বা কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে শুনিনি। আমরা চাই এই ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

মাজারের খাদেম মো. সাইদুর রহমান (৭০) বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে মাজারের দায়িত্বে আছি। বাপ-দাদাদের কাছ থেকে জানতে পারছি, মোঘল সম্রাটের আমলে মাজারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিবছর হাজারো ভক্ত এখানে আসে। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে হামলা, ভাঙচুর ও মলমূত্র নিক্ষেপের ঘটনায় কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে শুনিনি।

একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর ময়মনসিংহ নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুতিয়াখালী বাজারে অবস্থিত আতায়ে রাসুল খাজা বাবার দায়রা শরিফ নামে একটি খানকায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। খানকায় আয়োজিত গানবাজনার প্রতিবাদে স্থানীয় জনতা এই হামলা চালায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুতিয়াখালী আতায়ে রাসুল খাজা বাবার দায়রা শরিফে প্রতি শুক্রবার রাতে সামা কাওয়ালি গানের আসর হয়। গত ১৭ বছর যাবত সরকারি জমিতে ওই খানকা গড়ে তোলেন স্থানীয় উসমান গণি ফকির।

খানকা শরিফের খাদেম উসমান গণি ফকির বলেন, ১৭ বছর ৯ মাস ধরে তাকে কেউ বাধা দেয়নি। হঠাৎ শুক্রবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটে কিছু দুর্বৃত্ত এসে ব্যাপক ভাঙচুর করে তার ১০–১২ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট করেছে। এখানে প্রতি শুক্রবার অনেক লোক এসে মিলাদ পড়ে। জিকির শেষে সামা কাওয়ালি গান হয়।

সুতিয়াখালী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও খানকা শরিফের দূরত্ব ৫০ গজের মতো। শুক্রবার জুমার নামাজের পর ইমাম মুসল্লিদের কাছ থেকে টাকা তুলতে মাইকে কথা বলেন। তখন ইমামের কাছ থেকে মাইক নিয়ে খানকা ভাঙার ঘোষণা দেন স্থানীয় এক যুবক।

হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর খানকা শরিফের খাদেম উসমান গণি ফকির ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মসজিদের মোয়াজ্জিন নূর মোহাম্মদ বলেন, ছেলেটি হুজুরের কাছ থেকে মাইক নিয়ে বলতে থাকে, গণি মিয়ার মাজারটি আমরা ভেঙে ফেলব, এখানে নষ্টামি হয়। এই বলে মাইক্রোফোন রেখে চলে যায়। পরে নামাজ শেষে ভাঙচুরের শব্দ শুনে গিয়ে দেখি, অনেক ছেলেপেলে মাজার ভাঙছে। কিন্তু সেখানে মসজিদের কোনো লোক ও মুসল্লিদের সম্পৃক্ততা ছিল না।

সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। যার দরুন সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত আসছে। প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও মাজার ভাঙচুর করা হচ্ছে, সেই সঙ্গে হত্যা করা হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। আজকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের অবস্থানে থাকলে এমনটি হতো না। আমরা চাই দেশে আইনের শাসন বাস্তবায়িত হোক।

ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তিনটি ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা হয়েছিল। তবে, মাজার সংশ্লিষ্ট বা মামলার বাদিরা সন্দেহজন কোনো ব্যক্তির নাম-পরিচয় বলতে পারেনি। যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে, আবারও নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হবে, মামলাগুলে যেন তদন্ত করে দোষীদের গ্রেপ্তার করে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!