ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ৫ বছর বয়সী শিশু নিছা মনিকে গণধর্ষণের পর নদীতে ফেলে হত্যার ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আসামি আরিফ ও রাকিব নামের দুই যুবক।
গতকাল মঙ্গলবার বিকাল থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তনয় সাহার আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেয় আসামিরা। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।
তারা হলেন, ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতোলা টাঙ্গাহাটি গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে আরিফ মিয়া (১৯) ও তাহের উদ্দিনের ছেলে রাকিব মিয়া (২১)।
বুধবার (১৭ জুন) বেলা ৩টার দিকে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান দু'জনকে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামি আরিফ ও রাকিব নামের দুই যুবক ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। জবানবন্দিতে তারা বলেন, চার জন মিলে ওই শিশুকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর নিছামনি জীবিত ছিল। পরে নিছামনিকে পানিতে ফেলে হত্যা নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ওই শিশুর মরদেহ নদ থেকে তুলে নিয়ে দাফনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। পরে গোসলের সময় ওই শিশুর শরীরে ধর্ষণের ক্ষত চিহ্ন দেখা যায় এবং স্পর্শকাতর স্থান রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে ধোবাউড়া থানায় খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। পরে ওই দিন রাতেই তথ্য-প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে ঘটনার সাথে জড়িত চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বিকালে স্থানীয় বাজার থেকে চিপস কিনে বাড়ি ফিরছিল শিশুটি। পথে চার তরুণের সঙ্গে তার দেখা হয়। মাগরিবের আজানের আগে তারা কদম ফুল দেওয়ার কথা বলে শিশুটিকে কৌশলে কংস নদের পাড়ের জঙ্গলঘেরা নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে নদীতে ফেলে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা।
নিহত শিশুটির ফুফু ফারহানা ইসলাম ঈষিতা অভিযোগ করে বলেন, চারজন যুবক মিলে আমার ভাতিজির ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। পাঁচ বছরের একটা শিশুর সঙ্গে এমন জঘন্য ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকেই এলাকায় বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমনকি মীমাংসা না করলে পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত শিশুর বাবা রাজু মিয়া বলেন, আমি আর কিছুই চাই না, শুধু আমার নিষ্পাপ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যার বিচার চাই। আমি অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।
এলাকার বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা রহমত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ জীবনে এই এলাকায় এমন নৃশংস ঘটনা কখনো দেখিনি। যারা ৫ বছরের শিশুর সাথে এই কাজ করেছে, তারা মানবতার সীমা অতিক্রম করেছে।
গোয়াতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম টুটন বলেন, নিহত শিশুটির বয়স এখনো পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ধোবাউড়া থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, শিশুর বাবার দায়ের করা মামলায় পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে সোপর্দ করা হলে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিিতে ওই শিশুকে ধর্ষণের পর পানিতে ফেলে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অপন দুই আসামিকে আজ বুধবার দুপুরে আতালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে একজনের বক্তব্য অনুযায়ী চারজনই এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে অপর তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ঘটনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। তবে প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহালে সুরতহাল প্রতিবেদনে জোরপূর্বক নির্যাতন ও হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বাকি দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবেদন খু্ব দ্রুত আদালতে জমা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ জুন রাত ৯ টার দিকে জেলার ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের টাঙ্গাটি মধ্যপাড়া গ্রাম থেকে নিছা মনির মরদেহ উদ্ধার পরে পুলিশ। নিসা মনি ওই গ্রামের রাজু ওরফে লাক মিয়ার মেয়ে। এ ঘটনায় সোমবার রাতে নিহত শিশুর বাবা রাজু মিয়া বাদি হয়ে ধোবাউড়া থানায় একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পরে উপজেলার টাঙ্গাহাটি গ্রামের রমজান আলীর ছেলে মারুফ মিয়া (১৯), দোলাল মিয়ার ছেলে আরিফ মিয়া (১৯), সাইদুল ইসলামের ছেলে সিয়াম মিয়া (১৮) ও তাহের উদ্দিনের ছেলে রাকিব মিয়া (২১)-কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন