সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে খোরাকির ধান নিয়ে ট্রাকে ফিরছেন শ্রমিকেরা। এই ধানই তাদের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তার ভরসা। তাড়াশে শেষের পথে বোরো ধান কাটার মহোৎসব। মাঠের সোনালি ফসল কৃষকের গোলায় তোলার পর এবার মেহনতি শ্রমিকদের ঘরে ফেরার পালা। তীব্র রোদ আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া ধানের ভাগ নিয়ে এখন নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন হাজারো কৃষিশ্রমিক। যাকে তারা বলছেন ‘খোরাকির ধান’ অর্থাৎ সারা বছর খাবারের জন্য ব্যবহার করা ধান।
রোববার (১৭ মে) সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস আঞ্চলিক সড়কে দেখা যায় এমন দৃশ্য। চলনবিলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ধান কাটা শেষ করে শত শত শ্রমিক ট্রাকে করে খোরাকির ধান নিয়ে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
ধানের বস্তার ওপর বসে থাকা ক্লান্ত শ্রমিকদের মুখে তখন ফুটে উঠেছে স্বস্তি আর আনন্দের হাসি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব দলবদ্ধ শ্রমিক দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন চলনবিলের মাঠে। নগদ মজুরির চেয়ে ধান কাটার বিনিময়ে ধানের ভাগ বা ‘খোরাকি’ পাওয়াই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলনবিলে এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় পারিশ্রমিকও বেশ ভালো পেয়েছেন তারা। একেকজন শ্রমিক ১০ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ধান পেয়েছেন। বাজারে চালের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এই ধান তাদের পরিবারের আগামী কয়েক মাসের খাদ্য নিরাপত্তার বড় ভরসা।
ট্রাকের ওপর বসে থাকা প্রবীণ শ্রমিক রহমত আলী হাসিমুখে বলেন, কয়ডা সপ্তাহ চলনবিলের মাঠে রোদে পুইড়া, পানিতে ভিজা ধান কাটছি। শরীর তো আর চলে না বাবা! কিন্তু এই যে ট্রাকে কইরা নিজের কামাই করা ধানের বস্তা লইয়া বাড়ি ফিরতাছি, এটা অনেক বড় আনন্দের। বাড়িতে বউ-পোলাপান পথ চাইয়া আছে। এই ধান দিয়া সারা বছরের ভাতের চিন্তা দূর হইলো।
বারুহাস সড়কে দেখা যায়, ধানের বস্তায় ঠাসা প্রতিটি ট্রাক যেন একেকটি ভাসমান উৎসবের মঞ্চ। খাঁ খাঁ রোদের মধ্যেও ক্লান্তি দূরে ঠেলে শ্রমিকেরা কেউ গান গাইছেন, কেউবা মেতে উঠেছেন চিরচেনা গ্রামীণ আড্ডায়। তাদের চোখে-মুখে আর ধান কাটার সেই হাড়ভাঙা খাটুনির ছাপ নেই, বরং সেখানে জায়গা করে নিয়েছে প্রাপ্তির আনন্দ।
ট্রাকগুলো যখন বারুহাস বাজার পেরিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সড়কের দুই পাশের পথচারীরাও শ্রমিকদের এই আনন্দঘন যাত্রা উপভোগ করছিলেন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিল অঞ্চলের বোরো মৌসুম শুধু স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য বদল করে না, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজারো ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকের সারা বছরের খাদ্যের সংস্থানও করে। ট্রাকে করে খোরাকির ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার এই দৃশ্য গ্রামীণ বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা ও খাদ্য নিরাপত্তার এক জীবন্ত প্রতীক।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন