শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জের সালেহা ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দুর্নীতির বরপুত্র হিসাবে খ্যাত শিক্ষক মো. আফছার আলীকে বদলি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাকে সিরাজগঞ্জের সালেহা ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার পাটগ্রাম অনাথবন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, বদলিকৃত কর্মকর্তাকে ১৫ জুনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হতে হবে। অন্যথায় ওই তারিখের অপরাহ্ণ থেকে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য করা হবে।
এদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি না-দাবি প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছা. আইরিন পারভীনের কাছে প্রধান শিক্ষক মো. আফছার আলীর কোনো আর্থিক দাবি, অগ্রিম, দাপ্তরিক মালামাল বা অন্য কোনো বকেয়া দায়-দেনা অবশিষ্ট নেই। সব হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তি হওয়ায় তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যয়নপত্রটি প্রদান করা হয়েছে।
তবে বিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রের অভিযোগ, না-দাবি প্রত্যয়নপত্রের স্বাক্ষর ১৫ তারিখের পরিবর্তে ১৩ তারিখ স্বাক্ষর নিয়ে কিছুই হবে না বলে অত্যন্ত কৌশলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে নানা ভাউচার নতুন করে সৃষ্টি করে তার কাছে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধ উপায়ে উত্তোলন করার জন্য রোববার (১৪ জুন) গভীর রাতে নামে-বেনামে ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করার নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন আফছার আলী।
এর আগে প্রধান শিক্ষক আফছার আলীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তৎকালীন পাবনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোস্তম আলী হেলালীর নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে একটি সুপারিশপত্র রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অঞ্চলে প্রেরণ করে। তবে পরবর্তীতে ওই সুপারিশপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে— শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হয়রানি, নিয়মবহির্ভূতভাবে গাছ বিক্রি, অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তি, বেতন বৃদ্ধি, প্রশংসাপত্র প্রদানে অর্থ গ্রহণ, ছাত্রী নিবাস ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, আইসিটি ল্যাব থেকে এসি অপসারণ, ফিডার স্কুল পরিচালনায় অনিয়ম, নিম্নমানের টিফিন বিতরণ এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আফছার আলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিরোধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ থেকে প্রকাশিত একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান এবং বর্তমানে নাটোর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোস্তম আলী হেলালী জানান, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষক আফছার আলীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য জানা যায়নি।
এসব বিষয়ে সালেহা ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফছার আলী বলেন, হঠাৎ করে জানতে পারি আমাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। সবকিছু গোছানোর স্বার্থে স্বাক্ষর গ্রহণ ও কাগজপত্রাদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গতকাল রাতে অফিস কক্ষে কাজ করা হয়েছে আজকেও সারাদিন কাজ করতে সময় লাগবে। তবে দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার পর কখনোই ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের সুযোগ নেই। আমিও নিয়মের বাইরে কাজ করব না।

