ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

তিন পিস্তল, দুই শটগান; যুবদল নেতা হত্যার দৃশ্য ধরা পড়ল সিসি ক্যামেরায়

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামের রাউজানের ব্যস্ত চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫)। হত্যাকাণ্ডের পর আতঙ্ক সৃষ্টি করতে অস্ত্রধারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পুরো ঘটনাটি বাজারের বিভিন্ন সিসি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে।

শনিবার (১৩ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মাসুদুল পাশের উপজেলা রাঙ্গুনিয়ার যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, পাঁচ থেকে সাতজন অস্ত্রধারী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাজারে আসে। তাদের মধ্যে একজনের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল, অন্যদের মুখ স্পষ্ট দেখা গেছে। হামলাকারীদের তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী এলাকা থেকে অটোরিকশায় করে চৌমুহনী বাজারে আসেন মাসুদুল। তাকে অনুসরণ করে আরেকটি অটোরিকশায় করে বাজারে পৌঁছায় অস্ত্রধারীরা। বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ানোর পর খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগলে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, গুলির আঘাতে মাসুদুলের মাথায় গুরুতর ক্ষতি হয়। তিনি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকে। এ সময় কয়েকজনকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, কেউ যেন কাছে না আসে এবং দোকানপাট বন্ধ করে চলে যায়। পরে তারা অটোরিকশায় করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।

ঘটনাস্থলটি রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। বাজারজুড়ে ৩০টির বেশি সিসি ক্যামেরা থাকলেও প্রকাশ্যে এমন হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

নিহত মাসুদুলের বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাসুদুল।

হত্যার পর মাসুদুলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোববার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা বালু ব্যবসা কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের জন্য নিহতের পরিবারকে থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বাজারজুড়ে আতঙ্ক

ঘটনার পরপরই চৌমুহনী বাজারের অধিকাংশ ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে চলে যান। সন্ধ্যার পর খোলা থাকা বেশিরভাগ দোকানও বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মাবুদ বলেন, দিনের বেলায় এত বড় গোলাগুলির ঘটনা আগে দেখেননি। তার মতে, এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বাজারে অসংখ্য সিসি ক্যামেরা থাকার পরও অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দ্বিধা করেনি।

উল্লেখ্য, প্রায় দেড় মাস আগে একই ধরনের হামলায় রাউজানের কদলপুর এলাকার শমসের পাড়ায় যুবদলকর্মী মুহাম্মদ নাসির নিহত হন। ঘটনাস্থলটি চৌমুহনী বাজার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টির পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, মাসুদুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিন থেকে চারজনের পরিচয় ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সবাই রাউজানের বাসিন্দা। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো তাদের কোনো দলীয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তারা বেতাগী দিক থেকে এসে রাউজানের কদলপুরের পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে পালিয়ে গেছে।