ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬

সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ : বাণিজ্যমন্ত্রী

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পর উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর কারণে প্রায় সাড়ে ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি জানান।

সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে বিভিন্ন উন্নত দেশের দেওয়া বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে, যা দেশের রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা সেপা স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বৈরী অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং তুলনামূলক ধীর রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে।

সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ সময়ে ৭৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।

মন্ত্রী আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২০২টি দেশ ও অঞ্চলে পণ্য রপ্তানি করলেও মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সেবা, হালকা প্রকৌশল, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্যসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে আংশিক রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের মাধ্যমে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ‘রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার স্বল্পসুদে প্রাক-জাহাজীকরণ ঋণ তহবিল এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ সুবিধা চালু রেখেছে। এছাড়া রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়ন উৎসাহিত করতে ‘কাগজ ও প্যাকেজিং’ খাতকে ২০২৬ সালের ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ভুটানের সঙ্গে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ১০০টি বাংলাদেশি এবং ৩৪টি ভুটানি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সেপা চুক্তির প্রস্তুতিও চলছে।

তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে বলে স্বীকার করেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা সার্ক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া আফগানিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।